দেশীয় কাপড় নিয়ে কাজ করছি মাত্র ৩ বছর হয়েছে। কিন্তু এই অল্প সময়ে আমাকে অনেকটা হতাশার মধ্যে যেতে হয়েছে। ব্যবসা করা মানেই রিস্ক নেয়া। আমি রিস্ক নিয়েছিও। কারন, আমি সম্পূর্ণ দেশীয় কাপড় নিয়ে কাজ করছি।
দেশীয় কাপড় নিয়ে কাজ করছি শুনে অনেকেই বলেছে, কেনো দেশীয় কাপড় নিয়ে কাজ করছো? ইন্ডিয়ান, পাকিস্তানি ড্রেস নিয়ে কাজ করো। কাস্টমার পাবা। সেল বেশি হবে।
কিন্তু আমার ইচ্ছেটায় অন্য রকম। আমি সবসময় চেয়েছি উদ্যোক্তা হতে। নতুন কিছু তৈরি করতে। নতুন কোনো ডিজাইন, তাও সেটা দেশীয় কাপড়কে কাজে লাগিয়ে। আমাদের তাঁতিদের কাজে লাগিয়ে। আমার মনে হয়েছে, এতে করে আমাদের তাঁতিদের তাঁদের পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় যেতে হবে না এবং আমিও দেশীয় কাপড়কে দেশ ছাড়িয়ে বিদেশের মাটিতেও পৌঁছাতে পারবো।
আমি আমার উদ্যোক্তা জীবনে গত তিন বছরে বার বার ঠকেছি এবং বার বার নতুন কিছু শিখেছি। আমার অর্থনৈতিক ক্ষতিও হয়েছে অনেক বার। কোয়ালিটি বুঝতে অনেকটা সময় লেগেছে। কাজের ধারা বুঝতে সময় লেগেছে। একজন কাস্টমারের সাথে কি বলে কথা শুরু করবো আগে তা বুঝতে পারতাম না।
এখন এগুলো আমার কাছে অনেক সহজ হয়ে গেছে। কাস্টমারের সাথে আন্তরিক হওয়ার চেস্টা আমার সবসময়ই থাকে। আর, আলহামদুলিল্লাহ আমার কাস্টমার গনও খুব আন্তরিক। আসলে কোয়ালিটি ঠিক থাকলে কাস্টমারকেও খুব তাড়াতাড়ি সন্তুষ্ট করা যায়।
সত্যি কথা হলো, যে কোন কাজে ভালোবাসা থাকলে সেই কাজ করতে আপনার যতই বাঁধা আসুক, আপনি সেই কাজ থেকে পিছুপা হতে পারবেন না।
মাস্টার্সের ক্লাস করতে করতে বিসিএস কোচিং এ ভর্তি হয়ে যাই। পরিবারের চাপে আমার নিজেরও খানিকটা মনে হয়েছিল মন দিয়ে পড়াশোনা করে বিসিএস এর মাধ্যমে চাকরী নিবো। কিন্তু কিছু দিন যাওয়ার পর কোচিং এর পড়ুয়া সব ছাত্রছাত্রীদের দেখে মনে হলো, বিসিএস চাকরীর জন্য যে একাগ্রতা প্রয়োজন সেটা আমার আছে কিন্তু বিসিএস এর জন্য সেটা আমার নেই। যে মনোযোগ আমি বিসিএস এ দিবো, তার চেয়ে অনেক বেশি মনোযোগ আমি আমার ক্রিয়েটিভ কাজে দিতে আগ্রহী।


এমন ভাবতে ভাবতেই ২০১৭ সালে মাত্র ২৫০০ টাকা বড় বোনের থেকে নিয়ে সাথে আমার বেস্ট ফ্রেন্ড,সে ও ২৫০০ টাকা নিয়ে, মোট ৫০০০ টাকা নিয়ে কাজ শুরু করলাম। কিছু ভালো মানের থ্রি পিস কিনে উদ্যোক্তা পথে হাঁটা শুরু করলাম। আমার প্রথম সেল হয় চাঁদপুরে। তারপর আমার আত্মীয় স্বজন, বন্ধুরা আমার থেকে নেয়া শুরু করলো। এমন চলতে চলতেই বুঝলাম শুধু কাপড় দেখতে ভালো হলেই হবে না, সেটার কোয়ালিটিও ভালো হতে হবে। তাই আস্তে আস্তে নিজে ডিজাইন করে আনস্টিচ ড্রেস তৈরি করা শুরু করলাম। কিন্তু এখানে এসে হোঁচট খেলাম। কোয়ালিটি ভালো, মজুরি ও বেশি কিন্তু ক্রেতার দামের সাথে আমার মিলে না। তাঁরা যে দাম বলতেন সেটা দিয়ে আমার কস্টিং ও উঠতো না।
এরপর মাথায় চিন্তা আসলো নিজের থেকেই কিছু তৈরি করতে হবে। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর মাস। নিজের স্বপ্নকে আর একটু বড় করে দেখবো বলে ছোট্ট একটা ব্লকের কারখানা শুরু করি। নিজের বাসার মধ্যেই সেটআপ টা করেছি।
সেদিন সন্ধ্যার পর কেমিক্যাল কিনতে গিয়েছিলাম। আসার পথে একটা বাইক থেকে আমার ব্যাগটা টান দিয়ে নিয়ে চলে যায়। অফিসের চাবি, বাসার চাবি, দুটো ফোন, আইডি কার্ড, ব্যাংকের কার্ড সহ আরো অনেক অতিব প্রয়োজনীয় জিনিস খোয়া যায়। মুহূর্তের মধ্যে আমার দিশেহারা অবস্থা। মনে মনে ভাবছিলাম, একটা নতুন কাজ শুরু করতে যাচ্ছি। আর তার আগে এমন একটা বাঁধা!!! ব্লকের ডায়েস আমি বানিয়ে নিয়ে আসি শুধু মাত্র ডিজাইনের জন্য।
কিন্তু তবুও আমি হাল ছাড়িনি। আশেপাশের কিছু মানুষ, যারা আমাকে নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা করেন, তারা আমায় বলেছিলেন, এগুলো ছেড়ে দাও। চাকুরী করছো, শুধু চাকুরীই করো। ব্যবসা তোমার দ্বারা হবে না। তবে তাদের কথা শুনে কখনো আমি দমে যাই নি। মনোবল হারাইনি। বরং, আরো বেশি মানসিক ভাবে শক্ত হয়েছি।
যার ফলাফল, এখন সারা বাংলাদেশে আমার তৈরি ব্লকের পোশাক সাপ্লাই করছি। ইনশাআল্লাহ সামনে আরো বড় স্বপ্ন দেখি।
আমার উদ্যোক্তা জীবনের একটা আনন্দের ঘটনা।
আমার পেইজে আমার নিজের ডিজাইন করা কিছু ব্লকের থ্রিপিস পোস্ট করি। এবং তাতে লিখে দেই হোলসেল করা হয়। পর দিন সকালে ১১ টার দিকে আমার বিজনেস নম্বরে একটা কল আসে। কেউ একজন ফোন করে বলেন, উনি সিলেট থেকে আসবেন এবং সরাসরি প্রডাক্ট দেখে অর্ডার করবেন। যেহেতু উনি কাস্টমার, তাই উনাকে আমার কারখানায় আসতে বলি। নির্দিষ্ট দিনে উনি আসেন আমার কারখানায় এবং আমিও অফিস ছুটি নিয়ে ঐ দিন কারখানায় থাকি। উনি আমার স্টকে থাকা প্রতিটি প্রডাক্ট দেখেন এবং সব প্রডাক্ট থেকে হোলসেলে অল্প অল্প করে সব আইটেম অর্ডার করেন। উনি সর্বমোট ১ লাখ ১০ হাজার প্রডাক্ট অর্ডার করেন একই সাথে।
এটা ছিলো আমার উদ্যোক্তা জীবনের সর্ব প্রথম সবচেয়ে বড় অর্ডার। আমি আলহামদুলিল্লাহ তাঁর সব প্রডাক্ট গুলো সাপ্লাই করেছি। উনিও পেমেন্ট করেছেন সাথে সাথে।
এরকম কত শত ছোট বড় আনন্দের ঘটনা আমার উদ্যোক্তা জীবনে ঘটে। এগুলো এক একটা আমাদের সফলতা। আমাদের কষ্ট করার পুরষ্কার। আমরা যদি লেগে থাকি, বাঁধা অতিক্রম করে নিজেদের লক্ষ্যে অবশ্যই পৌঁছাতে পারবো ইনশাআল্লাহ।

প্রতিষ্ঠাতা ও ডিজাইনার
Dirgho-ঊ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here