তখন মাঘের প্রায় শেষ, গাছে গাছে আমের মুকুলের ঘ্রাণ। চারিদিকে পলাশ শিমুলের আসি আসি ভাব । প্রকৃতির এমন সাজ সাজ আমেজকে সাথে নিয়ে তৃতীয় দিনের মতো মেলা শুরু হয় ৬ ফেব্রুয়ারি ।
বেলা গড়াতে থাকে আর মেলায় ভিড় বাড়তে থাকে । নবীন প্রবীণ উদ্যোক্তার স্টলে আগ্রহী ক্রেতার উঁকিঝুঁকি বাড়তে থাকে । কেউ কেনেন আবার কেউ ভিডিও কলে বাসায় থাকা স্ত্রীকে দেখান এই জিনিস কিনবেন কিনা , কেউ কেউ মেলায় কি কি উঠেছে তার একটা বিবরণ বলতে থাকেন ফোনে ।
মেলায় আগতদের এমন উৎসুক আচরণ মুগ্ধ করে ক্রিসটাং এর হোসনে এমদাদকে । তিনি তার সুতার তৈরি গহনার ডালা খুলে দেন সকলের সামনে । লাল , নীল , হলুদ সহ নানা রকমের সুতা দিয়ে তৈরি গহনা গ্রাহকের মন কেড়ে নেয় । সেলফি ক্যামেরা সচল হয়ে যায় কারোর কারোর ।
আদি ঐতিহ্য শিকা বা বর্তমানে প্ল্যান্ট হ্যাংগার নিয়ে মেলায় স্টল দেয় থ্রি সিস্টার্স টুইস্ট ক্রাফট । দাদি নানীর কাছ থেকে শেখা ছোট বেলার সেই শিক্ষা এই বড় বেলায় এসে কাজে লাগাবেন তা জানতেন না লতিফা , সালমা এবং মিরা । সময় এবং কোভিড পরিস্থিতি তাঁদের এমন কাজে উদ্বুদ্ধ করে ।
নাইমা ইসলাম দেশের প্রথিতযশা উদ্যোক্তা । ১৯৮৫ সাল থেকে কাজ করছেন । মেলায় আসা নবীনদের নিজের অভিজ্ঞতা শেয়ার করে নানাভাবে তিনি উজ্জিবীত করেন । তার স্টলে ছিল ভেজিটেবল ডাই করা নানা রকম পোশাক ।
আবিদা সুলতানার ব্রাইডাল কালেকশনের আর্টিফিসিয়াল ফুল ছিল বেশ আকর্ষণীয় । কাঁচা ফুলে যাদের এলার্জি আছে কিংবা চাহিদা অনুযায়ী বাজারে না থাকার কারণ হয়ত এমন ফুলের বাজার তৈরি করছে । ফাগুন বা বিয়ে বাড়িতে উজ্জ্বল করে সাজাতে অথবা যে কোন সময় নিজেকে ফুলের সাজে সাজিয়ে তোলার বিষয় তুলে ধরেন প্রতিষ্ঠানের কর্নধার আবিদা ।


পাটের পণ্য নিয়ে স্টল দেন তুহিন আপা । নানা রকমের হ্যান্ড ব্যাগ , জুতা , পার্স , লাঞ্চ বক্স বা পানির বোতল রাখার পাটের ব্যাগ ইত্যাদি ছিল জুটমার্টের কালেকশনে । প্লেইন ব্যাগে লোগো বসিয়ে দেয়ার কাজ পারবেন কিনা , পারলে – কয় দিনে সাপ্লাই দেবেন , কতটা পারবেন , দাম কেমন রাখবেন ইত্যাদি নিয়ে চুলচেরা দরাদরি ও ছিল উপভোগ্য ।
ফিনারির স্টলের ড চিংচিং ছিলেন হাস্যজ্জল । ভীষণ মিশুক ড চিং এর পণ্যের বিশেষত্ব হল রিকশা পেইন্ট । এ বছর বেশ কিছু নতুন কিছু পণ্য নিয়ে হাজির হয় ফিনারি । ড চিং এর দেশীয় এবং দেশজ ক্রাফটস একসাথে কাজ করবে এমন একটা পরিকল্পনার ঘোষণাও মেলায় আসে ।
সোহেলি শারমিনের যশোর স্টিচের সিল্ক সম্ভার ছিল যশোর সাতক্ষিরা অঞ্চলের ঐতিহ্য নিয়ে । প্রায় ৩০০ মেয়ে উনার তত্তাবধানে কাজ করছে । নিজস্ব ডিজাইনে তিনি তার এলাকার এই ঐতিহ্য লালন করে চলেছেন ।


ফাহমিদা নূরের ব্লক বাটিক কালেকশনের সাথে সেলিনা আপুর ক্রিয়েশন ম্যাজিক এর নিজস্ব পোশাক ছিল আকর্ষণীয় । হেন্নাস কালেকশন , নিসর্গী , দিগন্ত হাউজ এবং আদনান শপ সহ সকলে মেলায় অংশ নিয়ে বেশ আনন্দ প্রকাশ করেন ।
দুপুর গড়িয়ে বিকেলে মেলায় গ্রাহকের ভিড় বাড়তে থাকে , ব্যস্ত হয়ে ওঠে উদ্যোক্তাদের প্রতিটি স্টল ।
সন্ধ্যা ৬ টায় সমাপনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ইয়ুথ এন্টারপ্রাইজ এডভাইস এন্ড হেল্প সেন্টার , বিয়াহ এর প্রোগ্রাম ডিরেক্টর মেহেদী হাসান কিংশুক, এবং প্রধান অতিথি ছিলেন ইসমাত রুমিনা , প্রফেসর , গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজ ঢাকা ।
দেশজের পক্ষ থেকে অতিথিদের সম্মাননা প্রদান করা হয় ।
প্রধান অতিথি ইসমাত বলেন , করোনা আমাদের অন্যভাবে আমাদের জাগিয়ে তুলছে। আইটি বা তথ্য প্রযুক্তি না জানলে, স্কিল ডেভেলপ না করলে পিছিয়ে যাব তাই এই ব্যাপার গুলো জানতে হবে। করোনায় এই আত্ম উন্নয়ন যারা করেছেন তারা এগিয়ে গেছেন।
বিশেষ অতিথি জনাব মেহেদী হাসান উদ্যোক্তাদের হাল না ছাড়ার আহবান জানান ।
সেরা স্টলের পুরস্কার পান নাইমা ইসলাম, রিফাত রেজা রাকা এবং অর্পিতা বড়ুয়া ।
অতিথিরা পুরস্কারপ্রাপ্তদের হাতে ক্রেস্ট তুলে দেন এবং মেলায় অংশ নেয়া সকল উদ্যোক্তার হাতে সনদ তুলে দেন রেইন ড্রপস টেক লিমিটেডের পরিচালক রওশন আরা ।
শুধু তাই নয় টেকনো হেভেনের পক্ষ থেকে সেরা ৩ স্টলকে ৫ হাজার টাকা প্রাইজমানি দেয়া হয় ।
মেলায় অংশ নেয়া উদ্যোক্তাদের জন্য প্রতিদিন ৩টা থেকে ৪টা পযর্ন্ত ছিল বিশেষ কর্মশালা।
উদ্যোক্তাদের দক্ষ করে তুলতে দেশজ এই কর্মশালার পরিকল্পনা নিয়েছে ।
দেশের স্বনামধন্য দক্ষ প্রশিক্ষকবৃন্দ প্রশিক্ষণগুলো পরিচালনা করেন।
প্রথম দিনের প্রশিক্ষণের বিষয় ছিল – কি করে ই কমার্স ব্যবসায় সফল হবেন।
এই বিষয়ে আজ প্রশিক্ষণ নেন বেসিসের ই কমার্স এলায়েন্সের আহবায়ক জনাব মোস্তাফিজুর রহমান সোহেল।
পণ্য , পণ্যের মূল্য নির্ধারন , পণ্যের বিপণন , ডিজিটাল মার্কেটিং এবং উদ্যোক্তার প্ল্যান ইত্যাদির সাথে সাথে তিনি অনলাইনে সাফল্যের টিপস বাতলে দেন ।
পণ্যের বিপণনে ক্রস বর্ডার পলিসি না বদলালে দেশের ই কমার্স এগুবে না, ক্ষুদ্র পরিসরে ব্যবসায়ীরা দেশের পণ্য রপ্তানি করতে বাধা গ্রস্থ হবে – জানান মোস্তাফিজুর রহমান সোহেল ।
মেলার ২য় দিন প্রশিক্ষণের বিষয় – কিভাবে অনলাইন ব্যবসা শুরু করবেন ।

প্রশিক্ষণ দেন – লিয়াকত হোসাইন , কো ফাউন্ডার ব্যবিলন রিসোর্স লিমিটেড, সেক্রেটারি জেনারেল আমরাই ডিজিটাল বাংলাদেশ। তিনি প্রশিক্ষনার্থীদের সততার সঙ্গে ব্যবসা করার গুরুত্ব দেন। পণ্য সম্পর্কে বিস্তারিত জানার ব্যাপারে জোর দেন। বিজনেস প্ল্যান, মার্কেট এনালাইসিস নিয়ে আলোচনা করেন। ব্র‍্যান্ডিং কেন দরকার, কিভাবে করতে হয় সেই বিষয়ও তুলে ধরেন।
এদিন মোহাম্মদ শাহাজালাল এবং নিশাত মাসফিকা ডোমেইন হোস্টিং নিয়ে আলোচনা করেন।
মেলায় অংশ নেয়া প্রতিষ্ঠানগুলো হল মাদল, ক্রিসটাং , সিস্টারস টুইস্ট ক্রাফটস, জুট মার্ট, ফিনারি, অয়ন ক্রাফটস, ঋষা, ইটসি বিটসি, দিগন্ত হাউজ, ব্রাইডাল ক্রিয়েশন, রেড ডিশ, আর্টিস্টিক ফ্যাশন ট্রেন্ড, হেন্নাস ক্লোসেট, সারাহ, চয়নিকা এপারেলস লিমিটেড, এম্বলেম বিয়া ফারাহ দিবা, ক্রিয়েশনস ম্যাজিক, আদনান শপ, দীর্ঘ ঊ, সিল্ক সম্ভার, কাদম্বরী, ওয়েন্ড, অর্থা ইত্যাদি।
দেশজ পণ্যের সমাহারের সাথে ছিল দেশজ ভোজের আয়োজন।
‘দেশজ ক্রাফটস’ তাদের ই কমার্স প্লাটফর্মের মাধ্যমে দেশের অনাচে কানাচে ছড়িয়ে থাকা ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পে নিয়োজিত মানুষের কাজ পৌঁছে দিতে চায় বিশ্বব্যাপী। উদ্যোক্তাদের ওয়েবসাইট নির্মান সহ যাবতীয় কাজে দেশজ পাশে থাকবে বলে জানান নিশাত মাসফিকা।
করোনা মোকাবিলায় নো মাস্ক নো সার্ভিস এর সাথে সব ধরনের সাবধনতা অবলম্বন করেছে মেলা কর্তৃপক্ষ ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here