রোডোস দ্বীপে


লিয়াকত হোসেন

রোডোস আন্তর্যািতক লেখক কেন্দ্র থেকে প্রায় দ’ুবছর আগে আমন্ত্রণ পেয়েছিলাম।
আমন্ত্রণ গ্রহণ করেও বিশেষ একটি কারনে যাওয়া হয়নি। যেতে না পারায় কেন্দ্রের প্রেসিডেন্ট অনুযোগ সহযোগে মেইল করেছিলেন। তাঁকে কথা দিয়েছিলাম পরবর্তী কোন এক সময় অবশ্যই লেখক কেন্দ্রের অনুষ্ঠানে অংশ গ্রহণ করব। এ’ বছর যখন দ্বিতীয়বার আমন্ত্রণ এলে আর দ্বিধা করিনি।

গ্রীসের একটি ছোট দ্বীপ রোডোস।
নীল উত্তাল ভূমধ্যসাগরে এক ছোট বিন্দু। গ্রীসের প্রায় বারশ থেকে ছয় হাজার ছোট বড় দ্বীপের মধ্যে রোডেস চতুর্থ বৃহৎ। তবে রোডোস রিজিয়নের বারটি দ্বীপের মধ্যে রোডোসই বড়, দ্বীপটির আয়তন মাত্র ১৪০০ স্কোয়ার কিলোমিটার। দৌর্ঘে ৭৯ কিলোমিটার আর প্রস্থে ৩৮ কিলোমিটার। জনসংখ্যা মাত্র ১১৭০০০ তবে দ্বীপটি গ্রীস মূলভূমি থেকে ৩৬৩ কিলোমিটার দূরে আর টার্কী থেকে রোডোসের দূরত্ব মাত্র ১৮ কিলোমিটার। বছরে তিনশ পয়ষট্টি দিনেই সূর্যের দেখা পাওয়া বলে নীল সাগরের উতাল হাওয়া দ্বীপটিকে করে তুলেছে বিশ্বের সেরা পর্যটন কেন্দ্র।

ষ্টকহোম থেকে বিরামহীন বিমানে যখন রোডোস এসে পৌছুলাম তখন ঘড়ির কাঁটা রাত এগারোটা ছুঁই ছুঁই করছে। বিমান পথে দূরত্ব মাত্র চার ঘন্টার। বিমানে তিল ধরনের ঠাই ছিলনা। তরুণ-তরুনীদের সংখ্যাই বেশী। সবাই ছুটছে ছুটিতে। ব্যাতিক্রম শুধু আমার মত কয়েকজন। লেখক কেন্দ্র থেকে আগেই জানানো হয়েছিল বিমান বন্দর থেকে ট্যাক্সি নিয়ে চলে আসতে। ওরা পথ ঘাট ভাল চেনে আর দিন রাত সর্বক্ষণই ট্যাক্সি পাওয়া যায়। বিমান থেকে নেমেই গরমের আঁচ পেলাম। বাতাশের তাপমাত্র উচ্চগামী, তার উপর জুলাই মাস। ট্যাক্সি চালক বেশ রসিক। এই প্রথম রোডোস আগমন যেনে গ্রীক মাইথোলজী থেকে রোডোসের পুরানো ইতিহাস আর বড় বড় স্থাপনা গুলো চিনিয়ে দিচ্ছিলেন। বিমান বন্দর থেকে লেখক কেন্দ্র আঠারো কিলোমিটার দুরে শহরের মন্টেস্মিত পাহাড়ের উপর লাসকউ ষ্ট্রীটে। ট্যাক্সি যখন গলি পথ দিয়ে পাহাড়ের উপর উঠে এলো তখন ভাবলাম এতো সরু একটা পথ ষ্ট্রীট হয় কি করে? হয়তো ছোট দ্বীপে সবই সম্ভব। রাত হয়েছে। ট্যাক্সি চালক নামিয়ে দিয়ে উইস করে চলে গেলেন। লেখক কেন্দ্রের আশে পাশে কাউকে দেখা গেলনা। অবশ্য এতো রাতে সম্ভব ও নয়। হঠাৎ করে এক বৃদ্ধা বেড় হয়ে এলেন। যদিও গ্রীক ছাড়া আর কোন ভাষা জানেননা তবুও ভাঙ্গা ভাঙ্গা ইংরেজীতে আমার জন্য নির্ধারিত কক্ষটি দেখিয়ে দিয়ে শুভরাত্রী জানিয়ে বিদায় নিলেন।

সকালে ঘুম ভাঙ্গলো সাগরের ঢেউ-এর মৃদু শব্দে।
ঘুম জড়ানো চোখে কিছুই বোঝা গেলনা। তবে জানালার পর্দা সরাতেই চোখ আটকে গেল নীল সাগর জলে। বাইরে প্রচুর রোদ, কেউ বা রৌদ্রস্নান করছেন, কেউবা স্পীটবোটে সাগর দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। তিনতলা লেখক কেন্দ্রের যে অংশে আমার স্থান নির্ধারন করা হয়েছে সে অংশটি নিকোস কাসডাগ্লিসকে উৎসর্গ করা। নিকোস কাসডাগ্লিস রোডোসের বিশিষ্ট সাহিত্যিক, ১৯২৮ সালে ইটালী অধিকৃত গ্রীসিয় দ্বীপমালার কস দ্বীপে জন্ম গ্রহণ করেন। পেশায় যদিও ছিলেন ব্যান্কার তবু নাজী জার্মানী ও ইটালী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। সে সময়কার ব্যাক্তিগত অভিজ্ঞতা তাঁর উপন্যাস গুলোয় প্রধান্য পেয়েছে। তিনি লিখেছেন প্রায় সাতটি উপন্যাস, তন্মধ্যে ‘আল্লাহ আকবর’ নামে বহুল পঠিত উপন্যাসটিও আছে। সাহিত্য কর্মের জন্য ১৯৫৫ সালে লাভ করেন জাতীয় সাহিত্য পুরস্কার। রোডোস আর্ন্তযাতিক লেখক কেন্দ্র স্থাপিত হয় ১৯৯৬ সালে। এই ধরনের একটি লেখক কেন্দ্র স্থাপনে অগ্রদূতের ভূমিকা পালন করেছিলেন নিকোস কাসডাগ্লিস। লেখক কেন্দ্র থেকেই প্রকাশিত হয়েছে তাঁর বিভিন্ন বই। কেন্দ্রে বিভিন্ন দেশ থেকে এসেছেন অনেকে। আমেরিকা, ইংল্যান্ড, স্পেন, ফ্রান্স সাহিত্যিকগন। ইটালী থেকে এসেছেন মারিও এ্যান্তেনীয়, গ্রীক মাইথোজীর উপর থিসিস করছেন। সুইডেন থেকে দ্বিতীয় কেউ আসেননি। তবে পূর্বের অনুষ্ঠান গুলোতে এসেছিলেন সুইডিশ রাইর্টাস ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট।

জানালা খুলে দিলেই সাগরের ঝড়ো হাওয়া।
তবে রোদের তাপ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে জানালাও বন্ধ করে দিতে হয়। এতো রোদ পোড়া গরমেও একটি জিনিস নজর কারে –লাল জবা ফুল। রাস্তা ঘাটে, বাড়ির আঙ্গিনায় লাল জবা। ফুঁলের চার পাশে সবুজ পাতা। গরম আর বৃষ্টির অভাবে যেখানে অনান্য গাছ গুলোর করুন অবস্থা সেখানে সতেজ লাল জবা দৃষ্টি কারে বৈকি। রোডোসকে বলা যায় লাল জবার দেশ। জুরিখের আনাচে কানাচে যেমন ষ্টকরোস বা হলিহুক ফুলের ছড়াছড়ি তেমনি লাল জবার ছড়াছড়ি রোডোসে। রোডোসের ঘরবাড়ির আঙ্গিনায় একটি প্রণীর আধিক্য লক্ষনীয়, প্রণীটি বেড়াল। সাধারনত কুকুর-বেড়াল শব্দ গুলো পাশাপাশি থাকলেও কুকুরের দেখা পাওয়া যায়না। বাড়ির আঙ্গিনায় বেড়ালেরা স্বপরিবারে ছানা সহ ঘোরাফেরা করে। রাইটার্স হাউসের পরিচারিকা জানালেন আগে এখানে বারটির মত বেড়াল ছিল। বড় হয়ে অনেকেই জীবিকার সন্ধানে এদিক ওদিক পাড়ি দিয়েছে। অবশিষ্ট আছে মাত্র গোটা চারেক। রাইটার্স হাউস থেকে ঢলু পথে নেমে প্রধান সড়কের বাদিকেই সীবিচ আর ডান দিকের রাস্তার শেষ মাথায় ঐতিহাসিক গ্রেন্ডমাষ্টার প্যালেস।

ষ্মৃতি
বাড়ির আঙ্গিনা পেরিয়েই বাঁদিকে রাস্তার ধারে এক জড়াজীর্ণ গাড়ি। ঝড় বৃষ্টি বাদলে জং পরে গেছে, ঝড়ো বাতাশ অনেক কিছুই উড়িয়ে নিয়ে গেছে। বায়ুহীন চারটে চাকা বসে গেছে পাথরের উপর। সামনের হেডলাইটের ঢাকনা গুলো নেই। গাড়ির পাশেই পাথরের ফাঁটল বেয়ে বেড়ে উঠেছে বোগেন ভিলা। যেতে আসতেই পথে পরে গাড়িটি। এমন অচল আর পুরানো গাড়িতো রাস্তার ধারে পরে থাকার কথা নয়। পদ্ধতিগত ভাবে বিলুপ্ত হবার কথা। কিন্তু হয়নি। লাল বাড়ির পাশেই দু’চারটি পরিবারের বসবাস। মূলত বাগানে জল দেয়া, বাড়ির দেখাশোনা তারাই করেন।

সেদিন রাত দশটায় ঘরে ফেরার পথে দেখি গাড়ির পাশে এক বৃদ্ধা দাঁড়িয়ে। হালকা আঁধারে সাদা জামা আর বাতাশে উড়ছে মাথার পিঙ্গল পাঁকা চুল। পাশের বাড়ির দরজা খোলা। মনে হল ওবাড়িতেই থাকেন। কাছে গিয়ে অভিবাদন জানিয়ে জানতে চাইলাম গাড়িটির কথা। স্বামীর গাড়ি। স্বামীই চালাতেন। রোজই প্রায় সারা দ্বীপ ঘুরে বেড়াতেন দু’জন। যদিও সেসময় দ্বীপে গাড়ি চলোনোর মত খুব একটা রাস্তা ছিলনা তবুও পাথরের উপর দিয়েই চালাতেন। সে ছিল এক সুখ সময়। আঙ্গুল গুনে গুনে ভাঙ্গা ভাঙ্গা ইংরেজীতে জানালেন আজ সাতাশ বছর গাড়িটি এখানেই আছে। নিয়মিত র্পাকিং ফি দিয়ে যাচ্ছেন তবে গাড়িটি ফেলে দিচ্ছেন না। স্বামীর স্মৃতি বয়ে বেড়াচ্ছেন। সাতাশ বছর স্মৃতি ধরে রাখলেও গাড়িটি আরো পুরানো। দেখে বোঝা যায়না কোন মডেল তবে ইটালিয়ান ফিয়াট হতে পারে। সাতাশ বছর আগে এক সড়ক দূর্ঘটনায় স্বামী মারা গেছেন। দেহের কোন কিছুই অবশিষ্ট ছিলনা। স্বামী ছিলেন জাহাজের নাবিক, আমেরিকান। জাহাজে দেশ বিদেশ ঘুরে বেড়াতেন। এভাবেই দ্বীপে আসা তারপর পরিচয়। সে আজ বছর চল্লিশ আগের কথা। পরিচয়ের পাঁচটি বছর গিয়েছে স্বপ্নের মতো। বিয়ের পর সব স্বপ্নই বাস্তবে রূপ নিয়েছিল। সে ঘরে দু’টি ছেলে আছে। দু’জনেই আমেরিকায় থাকে। তিনি দ্বীপেই আছেন স্বামীর স্মৃতি আর গাড়িটি নিয়ে। বললাম, গাড়িটি ফেলে দিলেইতো পার? চমকে উঠে বৃদ্ধা ভাঙ্গা ভাঙ্গা ইংরেজীতে বললেন,‘নো মিষ্টার, ইউ ডোন্ট আর্ন্ডাস্ট্যান্ড, আই ক্রাই।’

গ্রেন্ডমাষ্টার প্যালেস
সমগ্র গ্রীসেই মাইথোলজী বা পৌরাণিক উপকথা ঘিরে আছে।
রোডোসও এর ব্যাতিক্রম নয়। সূর্যদেবতা হেলিয়োস রোডোসকে বধূরূপে গ্রহণ করে আলোর ছটা ও উষ্ণতা দান করেন। এ’জন্য রোডোসে বছরের তিনশত দিন সূর্য়ের প্রাধান্য। সূর্যদেবতা ও রোডোসের পুত্র কার্কেফোস। কার্কেফোসের তিন পুত্র কেমিরোস, ইলাসোস ও লিন্ডোস। তিন পুত্রের নামানুসারে তিন শহরের নাম। রোডোস থেকে ৩৪ কিলোমিটার দূরে দক্ষিণ-পশ্চিমে কামিরোস শহর। এখন ধবংস স্তুপ। রোডোসের ৮ কিলোমিটার দূরে ইলাসোস শহর। আর লিন্ডোসের দূরত্ব ৪৭ কিলোমিটার। তিনটি শহরের পরস্পর সহযোগিতায় নতুন একশহরের গোড়াপত্তন হয়। এ’ভাবেই যীশুর জন্মের ৪০৮ বছর আগে জন্ম নেয় রোডোস শহর।
জেরুজালেম পতনের পর বিতারিত সেন্ট জন সাইপ্রাসে আশ্রয় গ্রহণ করেন।
এবং সেখান থেকে ১৩০৯ সালে রোডোসে উপস্থিত হন। দীর্ঘ দু’বছর অবরোধের পর রোডোসের পতন হয়। সেন্ট জনই রোডোসে ‘গ্রেন্ড মাষ্টার’ সাম্রাজ্যের সুচনা করেন। ‘গ্রেন্ড মাষ্টার’ বংশ ধরেরা বংশ পরস্পরায় ২০০ শত বছর রোডোস শাসন করেন। অবশেষে প্রথম সোলায়মান ১৫২২ সালে একলাখ সৈন্য নিয়ে রোডোস আক্রমন করেন। এবং ১৫২৩ সালের প্রথর্মাধে নাইটসরা বিতারিত হলে অটোম্যান সাম্রাজের সূচনা হয়। প্রায় ৪০০ বছর অটোম্যান সাম্রাজ্য স্থাযিত্ব লাভ করে। অবশেষে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর ১৯৪৭ সালে রোডোস গ্রীসে ফিরে আসে।
এ্যাথেন্সে যা দেখেছি এখানেও অনেকটা সে রকম।
পুরানো ঐতিহাসিক স্থাপনা গুলোর আসে পাশেই বাজার গড়ে উঠেছে। সমুদ্রের ধারে গ্র্যান্ডমাষ্টার প্যালেস বেশ জায়গা জুড়ে। পুরানো স্থাপনার পাশাপাশি আধুনিক স্থাপনা ও গড়ে উঠেছে। তবে অবাক হয়ে দেখতে হয় গ্র্যান্ডমাষ্টার প্যালেসের ভেতর ১৫শ শতকের তৈরী সোলেয়মান মসজিদ, আগা মসজিদ। যদিও মসজিদ গুলা বন্ধ তবু ঐতিহাসিক মূলবোধে অক্ষন্ন।

প্যালেসের পাশেই গড়ে উঠেছে বাজার।
পুরানো শহরের রাস্তা গুলো সরু। অলিগলি আঁকাবাঁকা পথ। প্রতিটি পথেই থরে থরে সাজানো দোকান। বিশাল বাজার এলাকাটি। পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষন। অলিগলিপথেই পরিচয় হয়ে গেল হাসানের সঙ্গে। রাস্তার পাশে বসা একজন বিক্রেতার সঙ্গে বাংলায় কথা বলছিলেন। এগিয়ে গিয়ে পরিচয় দিতেই হাতবাড়িয়ে দিলেন। বয়েস সাতাশ আটাশের বেশী হবেনা। এসেছেন বরিশাল থেকে। এই দ্বীপে আছেন প্রায় সাত বছর। থাকাটা সম্পূর্ন বেআইনী। যে কোন সময় ধরা পরতে পারেন। স্থানীয় পুলিশ দেখেও, জেনেও না জানার না দেখার ভান করে। তবে ধরা পরে গেলে রক্ষা নেই। তাই প্রতি পদক্ষেপে পুলিশ এড়িয়ে চলেন। দ্বীপ থেকে বেড় হতে পারেনা। এভাবে আছেন প্রায় আরো শ’খানেক বাংলাদেশী। এ্্যাথেন্সের মোনাসটিরাকী স্কোয়ারের কথা মনে পরে। ওখানে দেখা পেয়েছিলাম অনেক বাংলাদেশীর। কেউ ফুল বিক্রয় করছেন, কেউ সাজিয়ে রেখেছেন আর্ট সামগ্রী, কেউ বা ছোট খাট দোকানে কাজ করছেন। অনিশ্চিত জীবন, তবে জীবন থেমে নেই।

লিন্ডোস
গ্র্যান্ডমাষ্টার প্যালেস ছাড়িয়েই রোডোস সেন্ট্রাল বাসষ্ট্যান্ড।
এখান থেকেই শীততাপ নিয়ন্ত্রীত বাসগুলো যাচ্ছে রোডোসের আনাচে কানাচে। বিভিন্ন রুটে সময় মতই বাস ছেড়ে যায। স্বল্প ভাড়ায় পুরো রোডোসই ঘুরে দেখা যায়। তবে বাসষ্ট্যান্ড গুলোতে বাসের সময় তালিকা ঝোলানো নেই, প্রথমদর্শনে দেখে বোঝার উপায় নেই এগুলো বাসষ্ট্যান্ড, মনে হবে ক্লান্তি দূর করার বিশ্রাম ছাউনি। ছোট দ্বীপ বলেই বড় শহরের মত টিপটপ নয়। ট্যাক্সী নিয়েও রোডোস ঘুরে ফিরে দেখা যায় তবে তা’ব্যায় সাপেক্ষ। সেন্ট্রাল বাসষ্ট্যান্ড থেকে বিমানবন্দরে বাসে যেতে যেখানে লাগে সোয়া দুই ইউরো সেখানে ট্যাক্সীতে লাগবে বাইশ ইউরো। তাই পর্যটকদের জন্য বাসই উত্তম পন্থা।
রোডোস দ্বীপের অন্যমত আকর্ষণ ৪৭ কিলোমিটার দূরে লিন্ডোস। ১৭ শতাব্দীর বাড়ি ঘর ছাড়াও রয়েছে এক্রোপলিস। ১১৬ মিটার উচু পাহাড়ের মাথায় ৪০০০ হাজার বছরের পুরানো এক্রোপোলিস। রোডোসে আসার চার দিনের দিন ঠিক হল লিন্ডোস দেখার। লিন্ডোসের গোড়াপত্তন হয় যীশুর জন্মের দশ শতাব্দী আগে। সে সময় পোতাশ্রয় ও ব্যাবসা বাণিজ্যের জন্য লিন্ডোসই ছিল প্রধানকেন্দ্র। যীশুর জন্মের প্রায় তিনশ বছর আগে তৈরী হয় এথনা মন্দির। মধ্যযুগে রোডোসের গোড়াপত্তনের পর লিন্ডোস ব্যাবসা বাণিজ্যে পিছিয়ে পরলেও ধর্মীয় আবাস্থল হিসেবে গুরুত্ব পায়। ১৫২২ সালে তুর্কী শাসনামলে এক্রোপলিস ধর্মীয় গৌরব হারিয়ে দূর্গ হিসেবে ব্যাবহৃত হয়। পরবর্ত্তী সময়ে ডেনিস প্রতœতত্ববিদদের সহায়তায় এক্রোপলিস ঐতিহাসিক গুরুত্ব লাভ করে। লিন্ডোসের জনসংখ্যা মাত্র ৮০০শত কিন্তু প্রতিবছর প্রায় পাঁচ লক্ষ পর্যটক লিন্ডোস দর্শনে আসেন।
জুলাইয়ের মাঝামাঝি, অত্যাধিক গরম। বেলা দশটায় রোডোস ছেড়ে সাড়ে এগারোটার মধ্যে লিন্ডোস পৌছে গেলাম। সমুদ্রের ধার দিয়ে বাস রুট। দুচোখ ভরে সমুদ্র দেখতে দেখতে লিন্ডোস পৌছা। এক্রোপোলিসের কাছেই বাসষ্ট্যান্ড। বাসষ্ট্যান্ড থেকে এক্রোপলিসে যাবার পথটি প্রসস্থ হলেও ঢালু। নিচের দিকে নেমে গেছে। রাস্তাটি শেষ হয়েছে বড় একটি চত্তরে। বিরাট একটি গাছকে ঘিরে চত্তর। গোল করে গাছের গুড়িটা শান বাঁধানো। শান বাঁধানো বেদীতে গাছের ছায়ায় অনেকেই বসে। চত্তরের ভেতর রেষ্টুরেন্ট, ছোট খাট দোকান। ছোট ট্যাক্সিষ্ট্যান্ড। তবে ট্যাক্সি গুলো দাঁড়াতে পারেনা। স্থানীয় পুলিশ সর্বক্ষণ ট্যাক্সিগুলোকে বেড় করে দিচ্ছে। ছোট যায়গা বলেই হয়তো। চত্তর পার হয়েই ডানদিকে গাধার খোয়ার। দুটি গাধা নিয়ে একজন চালক। গাধার পিঠে সোয়ার হয়ে ১১৬ মিটার উচু পাহাড়ের অনেকটা কাছে যাওয়া যায়। অথবা পাথরের ঢালু সিঁড়ি বেয়েও উঠা যায়। তবে ছোট ছোট পাথরের তৈরী সরু সিঁড়ি গুলো জুতার ঘসায় ঘসায় খুবই মশৃণ। সিঁড়ির দুপাশে ছোট ছোট দোকান। সবই পর্যটকদের আকর্ষণ করার জন্য। বেশ কিছুদূর সিঁড়ি দিয়ে উঠে ফিরে এলাম। মাথার উপর ঘাম ঝরানো রোদ আর মশৃণ সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠা অনেকটাই সম্ভব নয়। সকাল ১১টা থেকে বিকেল তিনটা অবধি সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠা বিপদজনক বলে সর্তক করে দেয়া হয়েছে। ভোর অথবা পরন্ত বিকেল উত্তম। কিন্তু এতো দূর এসেতো আর ফেরা যায়না? তাই গাধাই ভরসা। গাধা চলে গদাই চালে কিন্তু গন্তব্যে ঠিকই যায়। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে নাজিরা নাকি পাহাড়ি অঞ্চল গুলোয় গাধায় করে অস্ত্র বহন করতো। গর্ধব যাত্রার অভিজ্ঞতা আগে হয়নি, হয়নি বলে যে হবেনা তাতো নয়—গাধার পিঠে উপরে যেতে পাঁচ ইউরো। এগিয়ে যেতেই চালক বাঁধা দিলেন। একা যাওয়া যাবেনা, দু’জন হতে হবে। বিফল হয়ে পাশে দাঁড়াতেই চালক ইশারা করলেন। আর একজন পাওয়া গেছে যিনি আমার মতই একা। দু’টি গাধার উপর আমরা দু’জন উঠে বসলাম। গাধার পিঠে নরম গদি পাতা। চালক চললেন হেটে, হাতে গাধার গলায় পেঁচানো দড়ি। মুখে বিচিত্র শব্দ। ঐ শব্দ শুনেই গাধা দ্রুত ও ধীর পদক্ষেপ নেয়। গাধার পথটি দীর্ঘ। ঘুর পথে উপরে উঠতে হয়। চালকের মুখের বিচিত্র শব্দে গাধা পাথরের রাস্তায় হেটে চলে। গাধা গুলোকে একেবারেই গাধা বলা যাবেনা। এরা অভিজ্ঞ। পথ চেনে। সর্বপরি চালকের শব্দ ধ্বনির তালে পা ফেলে। কেউ কিছু না বুঝলে আমরা তাকে গাধা বলি। কিন্তু এই প্রানী গুলোতো বুঝে। পাথুরে পথ আর পাথুরে সিঁড়ি দিয়ে গাধা গুলো উপরে উঠে যায়। উপরে উঠে যেখানে থামে সেটাকে গাধার ষ্টেশান বলা যায়। অনেক গুলো গাধা দাঁড়িয়ে। চালকেরা গাছের ছায়ায় জড় হয়ে বসে আলাপ করছে। কেউ যদি গাধার পিঠে সওয়ার হয়ে ফিরতে চান তবে আরো পাঁচ ইউরো। গাধা থেকে নেমে এগিয়ে গেলাম। সামনে কাঁচ ঘেরা টিকেট ঘর। এথনার মন্দিরে যেতে হলে টিকেট নিতে হবে, মূল্য ছয় ইউরো। সুইডিশ রাইটার্স ইউনিয়নের মেমবারশীপ কার্ডটা দেখাতেই ফ্রি টিকেট পাওয়া গেল। এগিয়ে যেয়ে বসলাম বাগানে অলিভ গাছের ছায়ায়। অলিভ গাছ জুড়েই ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক। বিরামহীন ডাক। পোকা গুলোকে দেখা যায়না। গাছের বাকলেরর রঙে রঙ বলেই মিশে থাকে বাকলের সাথে। অলিভ বাগানের ধার দিয়েই উপরে ওঠার সিঁড়ি। আশিটি সিঁড়ি পেরিয়েই এথনার মন্দির। গাধার পিঠে সওয়ার হয়ে আর যাওয়া যাবেনা। পদ যুগলই ভরসা। অন্যকোন পন্থা নেই। ভেবে অবাক হতে হয় সরু পিচ্ছিল সিঁড়ি গুলো মারিয়ে শাসকবর্গ কেমন করে উঠতেন? নিচে পরে যাবারতো শত ভাগ সম্ভবনা তার উপর ঘসায় ঘসায় পাথরের সিঁড়ি গুলো এতই মশৃন যে পা পিছলে যেতে পারে। এতোদূর এসে ফিরে যাবো? ভাবা যায়না। অলিভ গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে ভাবতে ভাবতেই দেখি অনেকেই উঠছে উপরে। ক্যামেরাটা শক্ত করে ধরে এগিয়ে গেলাম। এতো আর হিমালয় পর্বত নয়, দেখাই যাক। জুলাইেয়ের অত্যাধিক গরম। চোখ ধাঁধানো র্সূযের আলো পাথরে ঠিকরে উত্তাপ ছড়াচ্ছে। সিঁড়ি ভেঙ্গে উপরে উঠে দেবী এথনার মন্দিরের দেয়াল ঘেসে দাঁড়াই। দেয়ালের পাশেই একটু ছাঁয়া। অনেকেই বসে। দূরে নীল ভুমধ্যসাগর। সাগরের জল প্রকৃতই নীল। এ’সাগর পাড়ি দিয়েই মিশর থেকে এসেছিলেন ক্লিউপেট্রা।

উপরে এথনার ভাঙগা মন্দিরে ছয়টি স্তম্ভ।
স্বাধীনতা,সভ্যতা, ন্যায়ের গ্রীক দেবী এথনা। এথনা মন্দিরের নিচেই ছিল রোমীয় মন্দির, গুদাম ঘর, শাসনকর্তদের বাসস্থান, বিচার কক্ষ । আজ আর অবশিষ্ট কিছু নেই শুধু ধ্বংস স্তুপ। এথনার মন্দির দেখে চিত্যচাঞ্চল্য হলোনা। এর চেয়ে এথেন্থসের এক্রোপলিশ আরো দৃষ্টি নন্দন। দেবী এথনার মন্দির দর্শন শেষে সিঁড়ি ভেঙ্গে নিচে নেমে এলাম। নিচের চত্তরে রোদে পোড়া অলিভ বাগান। এখানেই হয়তো রাজকুমারীরা বিকেলে হাওয়া খেতে আসতেন। বাগানে মাত্র কয়েকটি অলিভ গাছ। রোদের তাপ থেকে ঐ গাছ গুলিই ছাঁয়া দিচ্ছে। বাগানটি বুক উচু পাথরের দেয়াল দিয়ে ঘেরা। নীচে গভীর খাদ। দূরে নীল ভুমধ্যসাগর।

সীমি ও প্রতেউস
রোডোস থেকে ছোট ছোট দ্বীপ গুলোতে জলপথই একমাত্র যোগাযোগের পথ।
সে কারনেই হয়তো রোডোস পোতাশ্রয়টি বিশাল। তবে এই পোতাশ্রয় থেকে শুধু নিকতবর্তী দ্বীপ গুলোতেই নয়, টার্কি ও ইসরাইলেও জাহাজ যাচ্ছে। রোডোসের কাছাকাছি সীমি ও প্রতেউস দ্বীপ দু’টির আকর্ষণ পর্যটকদের কাছে কম নয়। সকালে যেয়ে বিকেলেই ফেরা যায়। ঐ দুটি দ্বীপেই যাওয়া ঠিক হল। এ’ছাড়া আকর্ষণ ছিল ভূমধ্যসাগরে নীল জলে বিহার। বিভিন্ন কম্পানীর জাহাজ বিভিন্ন সময়ে যাতায়াত করছে তবে টিকেট আগে থেকেই বুকিং দিয়ে রাখা ভাল। রোডোস থেকে সীমির দূরত্ব বেশী নয় মাত্র ৪১ কিলোমিটার তবে টার্কী পেনিনসুলা থেকে দূরত্ব আরো কম, মাত্র ১০ কিলোমিটার। দ্বীপটির আয়তন ৬৬ কিলোমিটার আর জনসংখ্যা ২৫০০ জন। রোডোস থেকে জলপথে দেড় ঘন্টার পথ। সীমিতে যাত্রা বিরতি তিন ঘন্টা। এই তিন ঘন্টায় সীমিকে ভাল করে দেখে নিতে পারেন। ফেরার পথে প্রতেউস দ্বীপে এক ঘন্টা যাত্র বিরতি। সারাদিন এভাবে কাটিয়ে সন্ধ্যায় ফেরা যায় রোডোসে।

রোডোস রিজিয়নের বারটি দ্বীপের মধ্যে রোডোসের পরই সীমি ও প্রতেউস দ্বীপ দুটি উল্লেখযোগ্য। গ্রীক মাইথোলজী বলে রোডোসের ইয়ালিসের কন্যা ছিলেন সীমি। এবং দ্বীপের প্রথম সন্তানের জন্মধাত্রী। তার নামানুসারেই দ্বীপেন নাম। বনভূমি সমৃদ্ধ সীমি দ্বীপের অধিবাসীরা ছিলেন জাহাজ নির্মান শিল্পে পারদর্শী। ট্রয় যুদ্ধে এই দ্বীপ থেকেই পাঠানো হয়েছিল বিশাল তিনটি যুদ্ধ জাহাজ। তেরশ শতকে রোডোসের নাইট্সরা দ্বীপের শাসন ভার তুলে নিয়ে দূর্গ স্থাপন করেন। দ্বীপের প্রধান কাজ ছিল নাইট্সদের জন্য জাহাজ তৈরী করা। এই ধারা বজায় থাকে অটোমান সামাজ্য পর্যন্ত। ১৫২২ সালে রোডোস দখল করার আগে অটোমানরা সীমি দখল করে নেয়। সেই থেকে সীমির ব্যাবসা বাণিজ্য, জাহাজ শিল্প, পঞ্জ ও মস্যশিল্পে অটোমান সাম্রাজ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সে সময় সীমিতে বছরে ৫০০টি জাহাজ নির্মান করা হতো। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে ইটালি অধিকৃত সময়ে ষ্টীম ইঞ্জিন চালিত জাহাজ প্রচলিত হলে সীমির জাহাজ শিল্পে ভাটা আসে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে কখনো ইটালি তখনো জার্মানী সীমি দখল করে অবশেষে যুদ্ধ শেষে ১৯৪৫ সালে সীমি গ্রীস অধিকার ভূক্ত রোডোস পোতাশ্রয় থেকে সীমির জাহাজ ছাড়ে সকাল দশটায়।
যেতে চাইলে একদিন আগেই টিকেট কাটা ভাল। টিকেট দেখিয়ে বিশাল জাহাজের তিন তলায় যেয়ে উঠতেই ধীরে ধীরে জাহাজ পূর্ন হয়ে গেল। প্রায় সবাই পর্যটক। অধিকাংশই স্ক্যান্ডিনেভীয়ান তরুন-তরুনী। শীতের দেশের মানুষ গুলো গরমের উষ্ম ছোয়া পেতে রোডোস সহ সব দ্বীপ গুলোকে বাঁচিয়ে রেখেছে। যেখানেই গিয়েছি গ্রীক আর ইংরেজী ভাষাভাষীর চেয়ে স্ক্যান্ডিনেভীয়ান দেশ গুলোর ভাষা কানে এসেছে বেশী। রোডোসের জনসংখ্যা একলাখ হলেও দ্বীপ জুড়ে তিন চার লাখ লোকের আনাগোনা। এবং এর অধিকাংশই স্ক্যান্ডিনেভীয়ান। দ্বীপ গুলোর ঐতিহাসিক নিদর্শন যতটুকুনা আকর্ষনীয় তার থেকে বেশী আকর্ষনীয় গ্রীক খাবার, উন্মুক্ত সীবিচ, অবাধ স্বাধীনতা যা তরুন-তরুনীদের আকর্ষন করে বেশী। সীমি গামী জাহাজে কোলাহলের শেষ নেই। ঠিক সময়েই জাহাজ ছাড়লো দৃষ্টি সীমানায়। রোডোস মিলিয়ে যেতেই বিশাল একটি দ্বীপের কোল ঘেসে ছুটে চলে জাহাজ। দ্বীপের পাহাড় গুলো সাদা মাটির। রোডোসের মত নয়। রোডোস অসংখ্য ছোট ছোট পাথর আর কোরালের তৈরী। সাদা পাহাড় দেখে অবাক হয়ে একজনকে প্রশ্ন করতেই ততধিক অবাক হয়ে উত্তর দিলেন,“ওটাতো টার্কী। টার্কীর মারমারিস দ্বীপ।” টার্কীর এতো কাছ দিয়ে জাহাজ চলেছে যেন সাঁতার দিয়েই ওপারে উঠা যায়।

সীমি জাহাজ ঘাটে নেমেই চোখে পরে ছোট পাথরের সেতু। সেতু পার হয়েই ওপারে যেতে হয়। সেতুর পাশেই একটি ঘোড়ার গাড়ি। ঐ গাড়িতে চড়ে সীমির দর্শনীয় স্থান গুলো ঘুরে ফিরে দেখা যায়। অনেকে বাইক নিয়ে দ্বীপটি ঘুরে আসেন। ছোট দ্বীপটি ঘুরে আসতে এক ঘন্টার বেশী লাগার কথা নয়। তবে পর্যটকরা মূলত সীমির সিগ্ধ নীল জলে স্নান করতেই আসেন। দ্বীপ জুড়ে বেশ কিছু দোকান। তন্মধ্যে সাগর থেকে তোলা কোরাল আর বিভিন্ন ধরনের স্পোঞ্জের দোকানই বেশী। আদিকাল থেকে সীমি কোরাল আর স্পোঞ্জের ব্যাবসা করে আসছে। দামের দিক দিয়ে খুব যে সস্তা তা বলা যাবেনা। ছোট একটি স্পোঞ্জের মূল্য পাঁচ ইউরোর নিচে নয়। কয়েকটি দোকান ঘুরে দেখতে দেখতেই বিরল কিছু রঙ্গীন কোরাল পাওয়া গেল। দোকানী জানালেন গভীর সমুদ্রথেকে তুলে আনা এগুলো। টেনিস বলের মতো রঙ্গীন একটি কোরালের মূল্য ষাট ইউরো তবে পঞ্চাশ ইউরোতেও দেয়া যেতে পারে। একটি পাত্রে বেশ কিছু সীহর্স। জলের ভেতর এ’গুলো লেজ দিয়ে দৌড়ে বেড়ায়। মুখটা ঘোড়ার মত বলেই নাম সীহর্স। বিভিন্ন শিল্পের পাশাপাশি চর্মশিল্পও সীমিতে প্রসার লাভ করেছে। বেশ বড় দুটি সাজানো গোছানো চামড়ার দোকান জাহাজ ঘাটে। চামড়ার ব্যাগ. র্পোটফলিও, জুতা স্যান্ডেল, পুরুষ ও মেয়েদের ফ্যাসানেবল জ্যাকেট, বেল্ট, গ্লাব্স ইত্যাদি। এখানকার চামড়ার সামগ্রী পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে রপ্তানী হয়। চামড়ার সামগ্রীর মূল্য সব দেশেই বেশী তবে সরাসরি কেনায় আর মধ্যভোগী না থাকায় মূল্য আওতার ভেতর পরে। এ’ভাবেই যাচাই করতে করতে চারশ ইউরোতে একটি সুদৃশ্য ব্যাগ পাওয়া গেল। দোকানী জানালেন এটির মূল্য ছয়শ ইউরোর উপর, সামার বলেই চর্ম সামগ্রীর উপর ডিসকাইন্ট চলছে। প্রশ্ন করলেন ক্যাশ দেবো কিনা? বর্তমান সময়ে ইউরোপীয় দেশ গুলোর মধ্যে গ্রীসিয় র্অথনীতি একটু হালকা হয়ে যাওয়ায় ক্যাশে বেচা কেনায় প্রধান্য, তবে মাষ্টার কার্ড বা ভিসা কার্ড যে চলছেনা তা’নয়। তবে সে পথে ক্যাশ হতে ব্যান্ক গুলো সময় নিচ্ছে বেশী। দোকানীকে বললাম,‘ট্রোজান যুদ্ধে তোমরা তিনটি যুদ্ধ জাহাজ পাঠিয়ে সাহায্য করেছিলে, আর আমাকে একটা ব্যাগ দিতে পারবেনা সে কি কথা?’ দোকানী হেসে বললেন,‘ঠিক আছে তুমি কার্ডই দাও।’ সীমিতে কোন বাঙ্গালি নেই তবে দু’জন পাকিস্তানী আছেন। বাঙ্গালিরা এই সুন্দর দ্বীপটির কথা ভেবে দেখতে পারেন।

সীমি দর্শন শেষে জাহাজ ছাড়লো আরো ছোট দ্বীপ প্রতেউসের উদ্দেশ্যে।
প্রতেউস দ্বীপটি আয়তনে ছোট হলেও ঐতিহাসিক গুরুত্ব কম নয়। পুরাকালের গ্রীস সমুদ্র দেবতা প্রতেউস। দেবতার নামানুসারেই দ্বীপের নাম। ট্রয় যুদ্ধের কথা আজো সবার মনে দোলা দেয়। র্¯úাটার স্বনামধন্য রাজা ও সুšদরী হেলেনের স্বামী মেনেলাউস এখানেই শত্র“কে বাঁধা প্রদান করেছিলেন। ট্রয় যুদ্ধে মেনেলাউস পরাজিত হলেও হোমারের কাব্য ইলিয়ড ও অডিসি তাঁকে অমরত্ব দান করেছে। প্রতেউস দ্বীপের দর্শনীয় ও পূজনীয় স্থান পেনোরমিতিস মনাস্ট্রী বা মঠ। মঠ পরিদর্শনে প্রায় সবাই আসেন। সীমিবাসীদের জন্যও এটি এক পূজনীয় স্থান। মঠে যে কেউ প্রবেশ করতে পারেন তবে মহিলাদের গায়ে চাঁদর চাপিয়ে যেতে হয়। কারো সঙ্গে চাঁদর না থাকলে মঠবাসীনিরা চাঁদর দিয়ে সাহায্য করেন। আর মুসলিমদের যেতে হয় পেছনের বিশেষ একটি দরজা দিয়ে। মঠের ভেতর প্রবেশ করেই দর্শনপ্রাথীদের চাপে বেড়িয়ে আসতে হল।

স্টক হোম
সুইডেনে থেকে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here