স্মিথহ্যাভেন মলটা অন্যান্য বড় মলের মতই ঝকঝকে। তবে বাইরে থেকে নয়। ভিতরে ঢুকলে বোঝা যায় তা।
বিশেষ করে জুয়েলারি শপগুলোর সেকশনটা আর তার সাথে লাগানো টিভানা টি শপটা। টিশপ এর নানা ধরনের টি এর সুবাস নিতে নিতে জুয়েলারি শপগুলোতে উইন্ডো শপিং করাটা আমাদের মত ইকোনমিকালি চ্যালেঞ্জড মানুষদের জন্য খারাপ না কোনভাবেই।
সেখানেই আছে প্যানডোরার শোরুম। ঝা চকচকে সব জুয়েলারি ঝকমক করছে। বাইরে থেকে দেখেই মনে হয়, দোকানে বিদ্যুতের ঝিলিক খেলা করছে এ মাথা থেকে সে মাথা।
আমি লং আইল্যান্ডের কথা বলছি। লং আইল্যান্ড হচ্ছে নিউয়র্কের একটা প্রান্ত। আমরা যে জায়গায় থাকতাম সেখান থেকে এক ঘন্টার দূরত্বেই বিশাল রহস্যময়ী অতলান্তিক আটলান্টিক।
তো যা বলছিলাম, প্যানডোরার কথা। উইন্ডো শপিং করতে করতেই ভেরোনিকা আমাকে বললো, আমরা কিন্তু চাইলেই এরকম ব্রেসলেট নিজেরা বানিয়ে নিতে পারি। ভেরোনিকা ইতালীয় বন্ধশোদ্ভূত। আমার প্রবাস জীবনের সবচেয়ে ভালো বন্ধু। তার বুদ্ধির প্রতি তার শত্রুও আস্থা রাখবে টাইপ একজন। আমি বললাম, কীভাবে?


সেই কীভাবের সুত্র ধরে আমরা তার অল্প ক’দিন পরই গেলাম মাইকেলস এ। চক্ষু ছানাবড়া শব্দটা যারা খালি পড়েছে আর শুনেছে, তাদের জীবনে অন্তত একবার হলেও মাইকেলস এ যাওয়া অত্যন্ত জরুরি বলে আমি মনে করি।
তাকের পর তাক ভর্তি সব স্বপ্ন সেই দোকানে। কী নেই ! ক্র্যাফটসের এক স্বর্গরাজ্য সেই মাইকেলস। সব রকমের ক্র্যাফটসের।
ভেরোনিকা নানা রকমের বিডস কিনলো, সাথে কর্ড, চেইন, লক। সে ব্রেসলেট বানাবে প্যানডোরার মত। তার র’ ম্যাটেরিয়াল দেখেই আমি কাত। আমি দিব্য দৃষ্টিতে দেখতে পেলাম কী ভয়ঙ্কর লোভনীয় একটা জিনিস হতে যাচ্ছে সেটা।
আমি বরাবরই ভীতু মানুষ। আমার কাছে পুরা প্রক্রিয়াটা খুবই কঠিন মনে হল। বিডসের পর বিডস জুড়ে তাতে কর্ড বা চেইন লাগানো, তারপর আবার লক জুড়ে দেওয়া, পুরোই মনে হল, এসব যারা করে তারা ওয়ান্ডার ওম্যান।
আমি নিজেকে কোনকালেই সেই কাতারের ভাবিনা। আমি তাই সহজবোধ্য কাঠ কিনলাম কয়েকটা। আর ইউ টিউব এর জ্ঞানের ভিত্তিতে প্রাইমার, রঙ, তুলি, সিলার।


ভেরোনিকা বাড়ি ফিরে ব্রেসলেট বানাতে বসে গেল। আর আমি কাঠ ঘষতে লাগলাম শিরিষ কাগজ দিয়ে। ভয়ে ভয়ে কাঁপা কাঁপা হাতে তারপর প্রাইমার, রঙতুলি আর সিলারের গল্প গাঁথা হল দিন কয়েক জুড়ে।
নিজের প্রতিভায় নিজে মুগ্ধ হওয়া মানুষ আমি এবার চমকে দিলাম আমার আশপাশের মানুষকেও। কী আঁকিনি ! সমুদ্র, পাহাড়, খোলা চুলের মেয়ে, বরফের মাঝে ফুটে থাকা লাল কার্নিভাল পাখি, ফল ঋতু, আর ভ্যানগগের স্টারি নাইট তো অতি অবশ্যই।
সুখ বেশিদিন সয় না, এটা বাস্তব সত্য কথা। আমি সব ফেলে আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে চলে এলাম পুবে। তখন হঠাৎ করেই অনলাইনে একটা কোর্সে চান্স পেয়ে গেলাম। আমেরিকান এক জুয়েলারি কম্পানি কয়েকজন কে জুয়েলারি মেকিং শেখাবে ট্রেনার দিয়ে।
আমি জ্যারড ভ্যানডেনবার্গ কে পেলাম আমার গাইড হিসেবে। শুরু হল ভেরোনিকার মত ব্রেসলেট আর মালা বানানো। কিন্তু আমাদের দেশে বিডসের কোয়ালিটি তত ভালো নয়। আর ভালো কোয়ালিটির কিনতে গেলে র’ ম্যাটেরিয়াল এই যে খরচ পড়বে, তাতে এন্ড প্রডাক্টের প্রাইস বেড়ে যাবে কয়েক গুণ।
তাও বানালাম বাজেট ক্রস না করে কয়েকটা মালা, ব্রেসলেট, দুল। আর সেই সাথে মেডিকেলে পড়ার সুবাদে প্রচুর জটিল আঁকাআঁকি করার অভ্যাস থাকায় ফ্যাব্রিকে করে ফেললাম কিছু হ্যান্ডপেইন্টিং।
নিজে কিছু করার ইচ্ছা সবসময়ই ছিল। একদম নিজে। যেখানে আমিই আমার বস হব। যেখানে আমাকে চাকরির ইন্টারভিউ দিতে হবে না, আমি চাকরি দেওয়ার জন্য ইন্টারভিউ নেব। আর যেখানে সৃষ্টিশীলতার সাথে বসতি হবে বারোমাস।
তাই শেষ পর্যন্ত তেমন আগুপিছু কিছু না ভেবেই শুরু করে দিলাম On Cloud Nine And Half. কয়েকটা গয়না আর অল্প কিছু হ্যান্ডপেইন্টেড ব্লাউজ পিস নিয়ে।
জীবন মুচকি হেসে এবার আর আমাকে হতাশ করেনি। আমি আড়াই বছর যাবত বহু চড়াই উতরাই পেরিয়ে এখনো টিকে আছি।
কিছু বিষয়ে পড়াশোনা করে সেই বিষয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট নয় এমন পেশায় নিজেকে নিয়োজিত করাকে আমাদের দেশে পাপ ভাবা হয় এক অর্থে। মেডিকেল সায়েন্স তেমন একটা বিষয়। সেই অর্থে আমি এক পাপী।
সৃজনশীলতার এই পাপ নিয়েই পথ চলতে চাই যতদিন নিঃশ্বাস আছে। ভবিতব্য কী জানি না। কিন্তু ইচ্ছা আছে ষোলআনা।
On Cloud Nine And Half নামটা আমার বরের দেওয়া। এটা একটা আমেরিকান ইডিয়ম। এর অর্থ অত্যধিক খুশি। আমি খুশির ওপর খুশি নিয়ে And Half এর ওপর দাঁড়িয়ে অন্যদেরকেও এই আনন্দে শরিক করতে চাই।
গল্পটা আটপৌরে। কিন্তু পথের শুরুটা নাটকীয়, পথ চলাটা অচিন্তনীয়, আর রঙতুলি নিয়ে টিকে থাকার লড়াইটা আর ইচ্ছেটা ইতস্তত নয় মোটেও, শেষকথা এই ট্রান্সফরমেশন বা রূপান্তর যেই নামেই ডাকা হোক না কেন, এই রসগন্ধবর্ণটা রাজসিক রোমাঞ্চকর !

আফরিন আহমেদ
প্রতিষ্ঠাতা
On Cloud Nine And Half

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here