নিজেকে আজীবন শিক্ষার্থী মনে করেন সত্য নাদেলা

আশরাফুল আলম জয়
প্রিন্সিপাল সিস্টেম আর্কিটেক্ট
শ্রোডার্স
লন্ডন

সিঙ্গাপুরে মাইক্রোসফটের এক সেমিনারে প্রতিষ্ঠানটির সিইও সত্য নাদেলার বক্তৃতা শুনছিলাম খুব মুগ্ধ হয়ে। খুব সুন্দর করে হাত নেড়ে নেড়ে গল্প বলার মতো করে কথা বলেন তিনি।

মানুষটির ব্যক্তিত্ব, কর্মজীবন ও দর্শন নিয়ে কৌতুহল অনেক দিনের।

ভারতের হায়দারাবাদের একটি শহরে বড় হওয়া সত্যের আগ্রহ ছিল ক্রিকেট নিয়ে। পড়াশোনায় খারাপ ছিলেন এমন বলা যাবে না, কিন্তু সরকারী কর্মকর্তা বাবা চাইতেন ছেলে যেন আরো ভালো করে।

পড়াশুনা শেষ করে ব্যাংকে একটা চাকুরী নিয়ে আর সপ্তাহান্তে শখের ম্যাচ খেলে বাকীটা জীবন আরামে কাটিয়ে দেওয়ার প্ল্যান ছিল তাঁর।

কিন্তু বাঁধ সাধল প্রযুক্তি নিয়ে তার আগ্রহ। তিনি অনুধাবন করলেন, প্রযুক্তি নিয়ে শুধু নতুন কিছু জানতেই ভালো লাগছে না, এটা দিয়ে নতুন কিছু বানাতেও দারুণ লাগছে।

এমনিতে কবিতা খুব ভালোবাসেন নাদেলা।

মীর্জা গালিবের একটি শায়েরের দু’টি লাইন তাঁর খুব প্রিয়ঃ

হাজারো খওয়াহিসেন এইসি কে হার খওয়াইস পে দাম নিকলে…
বহাত নিকলে মেরে আরমান, লেকিন ফির ভি কাম নিকলে।

শায়েরটির অনুবাদ দাঁড়ায়ঃ
হাজার বাসনা ছিল জীবনে, প্রতিটির জন্য যেন জীবন দিতে পারি…
বাসনা পূরণ হয়েছে অনেকই, তবু মনে হয় অনেকতো বাকী।

মীর্জা গালিবের এই দার্শনিক শায়ের মানুষের চিরন্তন আকাঙখাপ্রিয় মনের কথা বলে। জীবনের পথ চলতে চলতে অনেক বাসনা থাকে মানুষের, যার অনেকটাই পূরণ হতে হতে আরো আরো নতুন নতুন অভিলাষ যোগ হতে থাকে। এইভাবেই শত পাওয়ার মাঝেও আমাদের তীব্র অতৃপ্তি নিয়েই আমাদের জীবন পার হয়ে যায়।

সত্য নাদেলা অনুভব করলেন, কবিতায় যেমন অনেক গভীর আবেগের কথা খুব সংক্ষেপে লেখা যায়, কম্পিউটারে প্রোগ্রাম লিখতে গিয়ে দেখলেন ব্যাপারটায় মিল আছে অনেক। ব্যস, চেপে বসল তাঁর যন্ত্রের জন্য কবিতা লেখার ঝোঁক। প্রযুক্তি নিয়ে নতুন নতুন উদ্ভাবনের ইচ্ছার যেন শেষ নেই তাঁর।

ভারতে সে সময়টায় কম্পিউটারে উচ্চতর ডিগ্রি করা যায় না বলে চলে গেলেন আমেরিকায়।

কম্পিউটার বিজ্ঞনে মাষ্টার্স করে কিছুদিন সান মাইক্রোসিস্টেমে কাজ করে সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠান মাইক্রোসফটে যখন যোগ দিলেন ১৯৯২ সালে, তখন প্রতিষ্ঠানটির অতো নামডাক হয়নি।

এর ভেতর আমেরিকায় এসে ইমিগ্র‍্যান্ট হিসেবেও সস্মুখীন হয়েছেন নানা ঝামেলার। দেশে থাকা প্রিয়তমাকে বিয়ে করে আনার জন্য তার গ্রীন কার্ড সারেন্ডার করে সাধারণ ওয়ার্ক ভিসায় নামতে হয়।

মাইক্রোসফটে ক্যারিয়ারের ২২ বছরের মাথায় যখন পৃথিবীর অন্যতম বড় সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠানটির সিইও হিসেবে নিয়োগ পেলেন সত্য নাদেলা, পুরো প্রযুক্তি বিশ্ব নড়ে চড়ে বসেছিল। মাইক্রোসফটের আগের দুই সিইও বিল গেটস আর স্টিভ বালমারের পর নতুন কে আসবে এ নিয়ে খুব কৌতুহল ছিল সবারই।

সিইও হিসেবে নিয়োগে তাঁর ইন্টারভিউতে সম্মুখীন হয়েছিলেন অদ্ভুত অভিজ্ঞতার।

এক প্রশ্নকর্তা জিজ্ঞেস করছিলেন, ধরো রাস্তায় যেতে যেতে হঠাৎ দেখলে একজন দুর্ঘটনায় পড়ল। সে মুহূর্তে তুমি কি করবে।

প্রশ্নটি শুনে সত্য ভাবলেন কিছুক্ষণ।

সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠানের সিইওর ইন্টারভিউ। প্রথমেই ভাবছিলেন কোন এলগরিমে উত্তর ফেলা যায়।

ভেবে টেবে শেষ পর্যন্ত উত্তর দিলেন, কি আর করবো, ৯১১ এর ইমার্জেন্সি সার্ভিসে কল দেবো।

ইন্টারভিউ বোর্ডের বক্তব্য ছিল, একজন মানুষ হিসেবে তোমার প্রথম দায়িত্ব ছিল মানুষটির পাশে যাওয়া, যতটুকু সম্ভব তাকে নিরাপদে রাখা। ইংরেজিতে যাকে বলে, এমপ্যাথি। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান হলেও এতোবড় একটি প্রতিষ্ঠান চালাতে হলে তোমাকে আগে মানুষের প্রতি সহমর্মি হতে হবে, তাদের সমস্যা বুঝতে হবে।

এমন কথা শুনে কিছুটা ঘাবড়ে যান সত্য নাদেলা। চাকুরিটা বোধ হয় আর হলো না, ভাবলেন তিনি।

তবে শেষ পর্যন্ত যখন সিইও হিসেবে নিয়োগ পান, এমপ্যাথি বা সহমর্মিতা নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করলেন। এবং বুঝতে পারলেন, মানুষের প্রতি সহমর্মিতা আসলে একধরণের শ্রদ্ধার অনুভূতি। এই অনুভূতি আসলে আমাদেরকে আরো বড় করে। অন্যের প্রতি সহমর্মিতার শ্রদ্ধা আমাদের মনের ছোটখাটো সংকীর্ণতার কারাগার থেকে মুক্ত করে দেয়।

এই ভাবনাই মাইক্রোসফটের মতো এতো বড় একটি প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করা অনেক সহজ করে দেয়। লক্ষাধিক এমপ্লয়ি থেকে শুরু করে প্রতিষ্ঠানটির শত কোটি ব্যবহারকারীদের জন্য নতুন অভিজ্ঞতা নিয়ে আসতে থাকে তাঁর নেতৃত্বে।

সিইও হিসেবে কাজ শুরু করার পর প্রথম দিকে কিছুটা সংকোচের মাঝে ছিলেন সত্য। আগের দুই সিইও বিল গেটস ও স্টিভ বালমার দু’জনেই জগদ্বিখ্যাত। তাদেরকে অনুসরণ করে নতুন সিইও হিসেবে আলাদা একটা চাপতো ছিলোই।

কিন্তু বিল গেটস এবং স্টিভ বালমার দু’জনেই বললেন, তাঁদের উদাহরণ নিয়ে আগানোর দরকার নেই সত্য নাদেলার। বরং ‘be yourself’ দর্শনেই আগাতে পারেন তিনি।

স্টিভ বালমারের সিইও কালীন মাইক্রোসফট তার সবচাইতে বেশি মুনাফা করলেও খুব বেশী উদ্ভাবন হতে পারেনি। মূলত ক্যাশ কাউ উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেম আর অফিস স্যুটের বিক্রি নিয়ে মনোযোগ দেয়াতে দিনে দিনে পিছিয়ে যেতে শুরু করেছিল প্রতিষ্ঠানটি।

সত্য নাদেলা সিইও হয়ে আসার পর প্রতিষ্ঠানটির ফিলোসফিতে আমূল পরিবর্তন এলো।

তাদের প্রোডাক্টগুলো শুধু উইন্ডোজ না, অন্যান্য অপারেটিং সিস্টেমেও সাপোর্ট দেয়া হলো। গুপ্তধনের মতো সোর্স কোড লুকিয়ে না রেখে উন্মুক্ত করে দেয়া হলো বেশীর ভাগ সফটওয়্যারের। শুধু ডেস্কটপ সফটওয়্যারের দিকে না তাকিয়ে থেকে পৃথিবীর মানুষকে আরো প্রোডাক্টিভ করার জন্যে মোবাইল ফার্স্ট, ক্লাউড ফার্স্ট স্ট্যাটেজিতে এগোতে থাকলো।

মাইক্রোসফটের এই মুক্ত দর্শনের সুফল পেতে দেরী হলো না। মুনাফা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকে, মাত্র পাঁচ বছরেই প্রতিষ্ঠানটির স্টকের দাম পাঁচগুন ছাড়িয়ে যায়।

সিইও হিসেবে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে কম্যুনিকেশন স্কিল। এ নিয়ে তাঁর পরামর্শ, যা কিছু বলবে তা যেন দৃঢ় ভাবে বলো, কিন্তু সেটা যুক্তিযুক্ত ও সত্য হয়।

তবে কম্যুনিকেশন স্কিলের পাশাপাশি জানার আগ্রহও একইরকম গুরুত্বপূর্ণ।

একটি ইন্টারভিউতে নাদেলা একবার বলেছিলেন, নিজেকে একজন আজীবন শিক্ষার্থী মনে করেন তিনি।

১৯৯০ তে কম্পিউটার বিজ্ঞানে মাষ্টার্স শেষ হলেও পরবর্তীতে ব্যবসা শেখার জন্য প্রতি সপ্তাহে সিয়াটল থেকে শিকাগো উড়ে গিয়ে এমবিএ ক্লাস করে আবার সিয়াটলে ফিরে কাজে যোগ দিতেন। শেখার প্রতি তাঁর স্পৃহা ও চেষ্টা সহকর্মীদের বেশ বিস্মিত করেছিল।

এখনো প্রতিনিয়তই নতুন কিছু শিখছেন, শেষ করতে পারেন আর নাই পারেন, নানা অনলাইন কোর্সের সাবস্ক্রিপশন নিতে থাকেন।

আমাদের সবাইকেই সত্য নাদেলার মতো মাইক্রোসফটের সিইও হতে হবে এমন নয়। তবে মানুষের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, নিজেকে জানা, জানার আগ্রহ ও সৎ থাকতে পারলে মানুষ হিসেবে আরো বড় হতে পারা যায়, এই শিক্ষার জন্যই তিনি সবার শ্রদ্ধার পাত্র হয়ে থাকবেন।

1 COMMENT

  1. সাবলীল লেখনীতে সত্য নাদেলার গল্প বলার জন্যে আশরাফুল আলম জয় কে ধন্যবাদ। আর, সোনালী সকালকে ধন্যবাদ এমন সুন্দর লেখাটা আমাদের দুয়ারে হাজির করবার জন্যে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here