আফিপের জন্মদিন

আফিপের জন্মদিন -কত বয়স – ১৩ পূর্ণ করে ১৪ তে পা দিল ও । আজ আমার ভিন্ন রকমের অনুভূতি হচ্ছে । বছরের এই দিনে এমন অনুভূতি হয় । ওর জন্মদিন অথচ কেমন যেন কান্না পাচ্ছে ! কেমন বুক ছিঁড়ে কষ্ট বের হচ্ছে ! কেমন সব এলোমেলো ভাবনা মাথায় আসছে । দুঃখ করো না বাঁচো – এই মূলমন্ত্র কে বার বার নিজেকে মনে করিয়ে দিচ্ছি । আউড়ে যাচ্ছি তবুও লাভ হচ্ছে না । কান্না করছি তাই – আগ্নেয়গিরির লাভা যেমন ধমকে থামানো যায় না তেমন করেই কান্না বের হচ্ছে ।
সুস্থ স্বাভাবিক বাচ্চার জন্য এক রকম অনুভব আর ভিন্ন রকম বাচ্চার জন্য ভিন্ন অনুভব । হাতের ৫ আঙুল সমান নয় কিন্তু তবু তারা সমান কারণ তাদের নাম আঙুল । তেমনি অধরার বেলায় যে অনুভব আসে না , আফিপের বেলায় অদ্ভুত সব অনুভব আসে ।
কেন এমন হলো ? কেন আমার সুস্থ কথা বলা বাচ্চাটা আজ মনের কথা প্রকাশ করতে কষ্ট পাচ্ছে ? কেন ওর আচরণ বুঝতে পারি না ? কেন আমি ওর একাকীত্ব মোচন করতে পারি না ? কেন এতো সুন্দর সন্তান আজ আমার – সমাজের বোঝা হয়ে যাচ্ছে ? এই সুন্দরের সংখ্যা দিনদিন বাড়ছে – কেন বাড়ছে ? আজ যদি আমার বাচ্চাটা অটিজম আক্রান্ত না হতো – কত আবদার – কত কত আকুল করা বাক্য আমাকে শুনতে হতো – অথচ আমি শুনছি না । কান পেতে আছি – তবু শুনছি না । ওর পছন্দ – ইচ্ছে – আগ্রহ সব নিয়ে হয়ত ১০০ বায়না করত । কই আজ ওর জন্মদিন , কিছু তো বলছে না ! কি হবে আজ আলাদা আয়োজন করে ? কি হবে ? কি হবে কেকের পসরা সাজিয়ে ! কি হবে নতুন জামা জুতা দিয়ে ! অদ্ভুত আচরণের মালিক আমার ছেলে – আমার সন্তান । কি হবে ওর জন্ম নিয়ে উৎসব আনন্দ করে ! ?


ও যখন জন্ম নেয় – ২০০৭ এর ৫ জুলাই । আমি তখন কেবল মাস্টার্স দিলাম । রেজাল্ট ও হয় নি । অধরা তখন ৪ বছরের । আফিপ কে পেটে নিয়ে ক্লাস করেছি , পরীক্ষা দিয়েছি । শাড়ি পরে যেতাম যেন কেউ আঁচ না করতে পারে । ধীরে ধীরে যেতাম যেন আফিপ ব্যথা না পায় । সিএনজি তে না গিয়ে ট্রেনে করে যেতাম যেন আমার পেটের বাবুটা আরামে থাকে । রেল লাইন ধরে হেঁটে আসবার সময় নেশাগ্রস্তদের নেশা করতে দেখে – ওদের চুল কাপড় চোপড়ের অবস্থা দেখে আমি ওই পথ বাদ দিয়ে চলা শুরু করেছিলাম কেবল ওর কথা ভেবে । কেবল ওর কথা ভেবে আমি কত কত ভিটামিন যুক্ত খাবার খেয়েছি , ইবাদত করেছি , ভাল ভাল চিন্তা করেছি , কাউকে কোনদিন মনের কষ্ট পেতে না দেয়ার জন্য সচেষ্ট থেকেছি । সংসার , লেখাপড়া , সন্তান সামাল দিয়ে দিয়ে দিন পার করেছি ।
অথচ সব ঠিক থেকেও আমার আফিপের অটিজম ধরা পড়ল । মাইল্ড অটিজম । আমি সেদিন যে পরিমাণ কেঁদেছি আমাকে আমার মা বাবা বিদায় দেয়ার সময় ও আমি এমন কাঁদি নাই । আমার ছেলের অটিজম !! কেন হবে ? কি কারণে হবে ? আমি তখন কেবল অটিজমের সাথে পরিচিত হয়েছি । মাস্টার্সের একটা কোর্স ছিল হেলথ এন্ড জার্নালিজম । এই কোর্সে আমি জেনেছি অটিজম সম্পর্কে । আমি জেনেছি – কি করে সাংবাদিকরা সহজ ভাষায় কঠিন রোগ সম্পর্কে পাঠককে অবহিত করবেন । আর আমার বাচ্চার এমন রোগ , এমন অসুখ – এটা আমাকে সহ্য করতে হবে ! এর চিকিৎসা নেই ! এর ব্যবস্থাপনা আছে । এর জন্য ওষুধ নেই , আছে পাহাড় পর্বত সম সান্ত্বনার বানী । এর সুরাহা নেই , আছে গোটা দুনিয়ার জল ভাগের সমান সহনশীল হতে হবে এমন কিছু ।
অথচ আমি অস্থির চরিত্রের । অথচ আমি এত সহনশীল নই । আমি চিৎকার করে কেঁদে উঠি যখন তখন । আমার বাচ্চার অটিজম! আমি বিশেষ মায়ের খেতাব নিয়ে ফেললাম । কেন এমন হবে ?
তবে কি আমি ভর দুপুরে কোথাও বের হয়েছিলাম বলে ? ভর দুপুরে খালের পাড়ে শ্মশান ঘাটে না বুঝে গেছিলাম বলে ? নাকি মাগরিবের সময় ওকে সিএনজিতে ব্রেস্ট ফিডিং করিয়েছিলাম বলে ? নাকি গ্রামের কোন এক অদ্ভুত হাওয়া ওকে বেশি পছন্দ করেছে ? নাকি আমার এম এ পরীক্ষার সময় কারো নজর লেগেছে ? নাকি আমার কোন গোপন কষ্ট বা দুঃখের খেসারত দিচ্ছে আমার সন্তান ? ! মানসিক চাপে থাকলে নাকি এমন হয় ! আমি কি তখন কিছুতে ছিলাম ! তাহলে কেন আমার কথা বলা ছেলে – সব ঠিক থাকা ছেলে আজ বেঠিকের কাতারে ? ! কেন এমন হয় !
আপনি স্বর্গে যাবেন – আপনার জন্য আলাদা হিসাবের খাতা এমন সব বাক্য আমাকে শান্ত করতে পারে না । আমি আমাকে অন্য কিছু দিয়ে শান্ত করি যেমন — এই তানিয়া , পাগলি মেয়ে – তোর ছেলে চোর হবে না , ছিনতাইকারি হবে না , জঙ্গি হবে না , টাউট হবে না , ফালতু হবে না , মানুষের ক্ষতি করবে না , গালি দেবে না , তোকে ছেড়ে সবাই চলে গেলেও তোর কাছে এই ছেলেই থাকবে । তবু মাঝে মাঝে সব বাক্য মরে যায় , মুছে যায় । চাই না আমার বেহেশত , চাই না । চাই নিউরলজিক্যাল ডিজর্ডারের এমন ব্যাধি আর কারুর না হোক । চাই রোগ নিরাময়ের ওষুধ ।

তাহমিনা তানিয়া

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here