শুধু মাত্র পরিধান সামগ্রী নিয়েই ফ্যাশন হয় না। ফ্যাশন এমন একটা বিষয়, আপনি নিত্য দিন যা কিছু করছেন সব কিছু নিয়ে ফ্যাশনের চলন।
নিউজ পেপার বা ই-নিউজ গুলো দেখলে লক্ষ্য করবেন, প্রতি বছর কি কি নতুন চলন আসলো, আর গত বছর কি কি চলন ছিল এই বিষয় গুলো উঠে আসে।
আমরা কিন্তু জেনে না জেনে প্রতিদিন ফ্যাশন নিয়ে ডিল করি। আপনি যে পোশাক পড়ছেন এবং যা কিছু করছেন তার সবকিছুই আপনার অনুভূতি প্রকাশ করে। এটা আপনার সম্পর্কে অনেক কিছু বলে দেয়।

ক্রমাগত পরিবর্তনের মাধ্যমে ফ্যাশনের রুপান্তর ঘটে। পুরোনো শৈলীর পুনর্নবীকরন এবং নতুন শৈলী প্রবর্তন ফ্যাশন রুপান্তরের মূল কারণ। অর্থাৎ, সময়ের সাথে সাথে আমাদের ফ্যাশন ভাবনারও পরিবর্তন ঘটে।
২০২০ সালে পোশাকের সাথে সাথে মাস্কের সম্পর্ক ছিলো অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িত। এছাড়া সিকুয়েন্স শাড়ি, মাইক্রো ব্যাগ, কেইপ, নিওন রঙের ছোঁয়া এগুলো আমরা ইন্টারন্যাশনালি বেশি দেখেছি। তার সাথে মিলিয়ে স্কার্ফ এবং মাস্কের প্রচলন সবচেয়ে বেশি ছিল। তবে কোরোনা কালীন পৃথিবীতে টাইট-ফিটেড পোশাকের পরিবর্তে মানুষ বেছে নিয়েছে ঢিলেঢালা আরামদায়ক পোশাক

আর বাংলাদেশের কথা যদি বলি, বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে সবচেয়ে বেশি চাহিদা ছিলো দেশীয় পোশাকের। একেবারে হাতে বুনানো তাঁতের শাড়ি থেকে শুরু করে জামদানীর প্রতি মানুষের আগ্রহ ছিল দেখার মতো। তাছাড়া ঘরে ব্যবহারের জন্য মাটির তৈজসপত্রের চাহিদাও চোখে পড়ে।

বর্তমানে বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ এখন ফ্যাশন সচেতন। দেশের বড় বড় ব্র্যান্ড গুলো লক্ষ্য করলে দেখবেন তারা প্রতিনিয়ত নিত্যনতুন কাস্টমাইজ পোশাক তৈরি করছে। এই জন্য মনোমুগ্ধকর ডিজাইন দেখে ক্রেতাও আগ্রহী হচ্ছেন ফ্যাশন হাউজগুলোর প্রতি। ফ্যাশন হাউজ গুলো বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী কাপড় নিয়ে নতুন করে কাজ করছে। এর মধ্যে জামদানী, মসলিন, গরদ, রাজশাহী সিল্ক, কাতান এই কাপড়গুলো অন্যতম।

শুধু বড় বড় ফ্যাশন হাউস নয় ছোট ছোট দেশীয় উদ্যোক্তারাও অনেক ভালো মানের কাজ করছে অনলাইনের মাধ্যমে। কোরোনা পরবর্তী সময়ে সবাই অনলাইনের প্রতি আস্থা রাখছে। তাই উদ্যোক্তারাও অনলাইনের মাধ্যমে ক্রেতাকে ভালো সার্ভিস দিতে পারছে।

বিশ্বে হোক বা বাংলাদেশ হোক, ফ্যাশন যখন যেমনই হোক না কেনো, পোশাকের ক্ষেত্রে আরামের কথা সবাইকেই মাথায় রাখতে হয়।

ট্রেন্ড বলতে আমরা কি বুঝি…

কোনো কিছু পরিবর্তনের প্রবণতা অথবা উন্নয়নের সাধারণ গতিধারাই হলো ট্রেন্ড। শাব্দিক অর্থ বলতে গেলে “প্রবণতা”।

ট্রেন্ড এবং ফ্যাশন এমন দুটি শব্দ যা সচারাচর আমরা পোশাক এবং স্টাইল নিয়ে আলোচনার সময় ব্যবহার করি।

একটা নির্দিষ্ট সময়ে কি জনপ্রিয় ছিল সেটাই ট্রেন্ড বোঝায়। ফ্যাশনের সাথে ট্রেন্ড এর ব্যাপক মিল। শুধু ট্রেন্ড শব্দটি ব্যবহার করলে বুঝতে পারবেন আপনার খাওয়া দাওয়া, ঘোরাঘুরি করা, পোশাক পরিচ্ছদ সব কিছুর সাথেই ট্রেন্ড শব্দটি জড়িত।

আমরা যদি চিন্তা করি পোশাক শিল্পে ২০২১ সালে কি ট্রেন্ড চলবে? তাহলে ২০১৯-২০২০ সালের বিশ্ব থেকে একটু চোখ বুলিয়ে আসতে হবে। তারপরেই আপনি বুঝতে পারবেন ২০২১ সালে পোশাক শিল্পে কি ট্রেন্ড চলবে।
ভোগ, দ্যা ট্রেন্ড স্পটার এর মতো বিশ্বমানের ম্যাগাজিন জানান দিচ্ছে ২০২১ সালে কালো মাস্কের জনপ্রিয়তা থাকবে তুঙ্গে। এছাড়া ২০ সালের মতোই ঢিলেঢালা আরামদায়ক পোষাক, সিল্কি স্কার্ফে চুলের সাজ, বেলুন স্লিভ বা ফোলা হাতের প্রচলন, জুতার মধ্যে হাই বুট এবং রঙের মধ্যে প্যাস্টেল রঙের আধিক্য থাকবে এ বছর।

এ তো গেলো ২০২১ সালে ফ্যাশনে কেমন ট্রেন্ড চলবে। কিন্তু ফ্যাশন ছাড়াও জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ট্রেন্ডিং আছে। যেমন ধরুন, আমরা যদি ২০২০ সালে ফিরে দেখি যে, এই বছরে মানুষের আগ্রহ ছিল কোন কোন বিষয়ে।

২০২০ সালে সবচেয়ে বেশি সার্চ করা হয়েছে কোরোনা ভাইরাস, জুম, ইলেকশন রেজাল্ট, ইরান, টম হ্যাক্স, জো বাইডেন, কিম জন উন, বরিস জনসন, কামালা হ্যারিস সহ আরো অনেক কিছু । তাছাড়া ইউটিউবে বিভিন্ন রেসিপি সার্চ করা হয়েছে অনেক বেশি । এ থেকে বুঝো নেয়া যায় বিশ্ববাসীর আগ্রহ কোন দিকে মোর নিচ্ছে।

আপনি ১০ বছর বা ২০ বছর আগের ছবি গুলো দেখুন। বাসায় পুরোনো এ্যালবাম থাকলে চোখ বুলিয়ে নিন। সেই সময়ে ছেলেরা কেমন দাড়ি রাখতো, চুলের কাটিং, প্যান্টের ডিজাইন কেমন ছিলো। মেয়েদের শাড়ির প্রিন্ট কেমন ছিল, চুল বাঁধতো কেমন করে, জুতার ডিজাইন কেমন ছিলো, এসব দেখলে আপনি বুঝতে পারবেন তখন কি ট্রেন্ড ছিলো আর এখন কি ট্রেনড চলছে।

তাহলে বুঝতেই পারছেন, সময়ের সাথে সাথে ফ্যাশনের পরিবর্তন ঘটে। সেই পরিবর্তন থেকে এক নতুন ট্রেন্ড চলে আসে।

বাংলাদেশে পাকিস্তান পিরিয়ড থেকে শুরু করে ১৯৯০ সালের আগে পর্যন্ত নারীদের মেট্রিক পাশ করার পরই শাড়ি পড়ার একটা প্রচলন ছিল। এমনকি বাল্যবিবাহ হলেও ওই ছোট্ট বয়সেই শাড়ি পড়তে হতো। কিন্তু আস্তে আস্তে সময় পরিবর্তন হয়ে গেছে। এখন উৎসব অনুষ্ঠান ছাড়া শাড়ি পড়তে তেমন দেখা যায় না। সে তুলনায় শাড়ি কেনার প্রতি নারীদের আগ্রহ কিন্তু কমে যায়নি।

তবে আশার কথা হলো বিগত বছর দুয়েক হলো বাংলাদেশী নারীরা দেশীয় শাড়ির প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছে। বাংলাদেশের জামদানী, রাজশাহী সিল্ক, মসলিন, তাঁতের শাড়ি এখন খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এই শাড়িগুলোর মধ্যে আবার বিভিন্ন ধরনের কাজ করা হচ্ছে। যেমনঃ ব্লক, বাটিক, এমব্রয়ডারি, সুতার কাজ, কাটওয়ার্ক, হ্যান্ডপেইন্ট, ইত্যাদি। এই ধরনের কাজ করার ফলে শাড়ি হয়ে উঠছে আরো আকর্ষনীয়। ফলে এই ধরনের শাড়ির ক্রেতার চাহিদাও বাড়ছে।
এ তো গেলো শাড়ির কথা। পুরুষের পোশাকের ক্ষেত্রে পাঞ্জাবির চাহিদা বরাবরের মতোই আছে। তবে পাঞ্জাবির ডিজাইন এবং রঙে অনেক খানি পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। শেরওয়ানি পাঞ্জাবি, শর্ট পাঞ্জাবি, লং পাঞ্জাবি, কাবলি, বালুচরে, জুব্বা, ব্লক-বাটিকের পাঞ্জাবি দেখা যায়। তবে, আগের দিনের মতো ঢিলেঢালা, হালকা রঙের পাঞ্জাবির চেয়ে একটু ফিটেড এবং প্রিন্টেড, গাঢ় রঙের পাঞ্জাবির জনপ্রিয়তা এখন বেশি। তবে পাঞ্জাবির সাথে প্যান্ট খুব জনপ্রিয় হলেও বর্তমানে পাজামার জনপ্রিয়তা আবারও ঘুরে ফিরে আসছে।

পুরুষের পোশাকে পাঞ্জাবি ছাড়াও টিশার্ট, শার্ট খুব জনপ্রিয়। বর্তমানে সুতি কাপড়ের ব্লক-বাটিকের শার্টের প্রচলন দেশীয় ফ্যাশন হাউসে শুরু হয়েছে। এছাড়া চেক শার্ট, হালকা রঙের শার্ট সবসময়ই জনপ্রিয়। তাছাড়া বয়স্কদের জন্য আরামদায়ক ফতুয়ার চাহিদা সবসময়ই বেশি।

নারীদের পোশাকের ক্ষেত্রে শাড়ির চাহিদা কমে গেলেও অন্যান্য পোশাকের চাহিদা কিন্তু বাড়ছে। থ্রিপিস, আনারকলির চাহিদা বেড়েছে। তবে নারীদের পোশাকের মধ্যে ওয়ানপিস বা কুর্তির চাহিদা ইদানীং ব্যাপক হারে বেড়েছে । বাংলাদেশী বড় বড় ফ্যাশন হাউজ গুলোতে গেলে দেখবেন বিভিন্ন ডিজাইনের কুর্তি। লং, শর্ট, সুতি, সিল্ক, জামদানী, কাতান, সহ ব্লক, বাটিক, এমব্রয়ডারি করা, সুতার কাজ করা, কারচুপি কুর্তি।

সিঙ্গেল কুর্তি গুলো যেকোনো প্যান্ট এবং ওড়না বা স্কার্ফের সাথে মিলিয়ে পড়া যায়। অফিস আদালতে, ঘরে বাইরে নারীরা এই ধরনের কুর্তি গুলো বেশি পড়ে। তাই, বাংলাদেশের ফ্যাশন বিশেষজ্ঞের মতে, নারীদের এই কুর্তির চাহিদা বেশ অনেক বছর পর্যন্ত থাকবে।

২০২১ সালে বাংলাদেশের ফ্যাশনে দেশীয় কাপড়ের ট্রেন্ড চলে আসছে। ২/৩ বছর আগেও বিদেশি কাপড়ের যে চাহিদা ছিলো, তার অনেকাংশ দেশীয় কাপড় পূরণ করতে সক্ষম হয়েছে। এবং এই চাহিদা সামনে অনেক বছর পর্যন্ত থাকবে বলে আশা করেন ফ্যাশন বিশেষজ্ঞরা।

বাংলাদেশের দেশীয় কাপড়ের উদীয়মান একটি প্রতিষ্ঠান Dirgho-ঊ। ৪ বছর আগে খুব অল্প মূলধন নিয়ে সল্প পরিসরে শুরু হয়েছিল। বর্তমানে Dirgho-ঊ কাজ করছে নিজস্ব ডিজাইনে তৈরি করা দেশীয় পোশাক নিয়ে । বাংলাদেশী মানুষের চাহিদা এবং ফ্যাশন ট্রেন্ড নিয়ে এগিয়ে যেতে চায় Dirgho-ঊ। দেশীয় পোশাক নিয়ে দেশ ছাড়িয়ে বিদেশের মাটিতেও ব্র্যান্ড হিসেবে পৌঁছাতে চায়।

লেখাঃ তাসনিয়া জহুরা
স্বত্বাধিকারীঃ Dirgho-ঊ

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here