কিছুদিন আগেও পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধি কিংবা জলবায়ু পরিবর্তন -এসব কথা কারো চিন্তাই আসতো না। কিন্তু বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তন শব্দটি সবচেয়ে আলোচিত ও সমালোচিত একটি বিষয়। বিজ্ঞানীরা অনেক আগে থেকেই বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করলেও মার্কিন প্রশাসন ২০০৫ সালে বিশ্ব উষ্ণয়নের অস্তিত্ব মেনে নেয়। সর্বপ্রথম ১৮২৭ সালে বিজ্ঞানী বিজ্ঞানী ফুরিয়ার এবং ১৮৬০ সালে বিজ্ঞানী টিন্ডাল জলবায়ু বদলে যাবার সম্ভাবনার কথা বলেছিলেন। মানুষের কর্মকা-ের কারণেই যে জলবায়ু বদলে যাচ্ছে সেটা ১৮৯৬ সালে বিজ্ঞানী আরেনিয়াস সতর্ক করে দিয়েছিলেন। তিনি সে সময় বলেছিলেন কল কারখানা থেকে নির্গত কার্বন ডাই অক্সাইড ধীরে ধীরে ভুপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বাড়িয়ে দিচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তন, ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং পরিবেশগত নানা বিপর্যয়ের কারণে বাংলাদেশের অবস্থা এখন খুবই নাজুক। ইতিমধ্যে বাংলাদেশে নানা ধরনের বিরূপ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। গ্রীস্মকালে তাপমাত্রা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে, অন্যদিকে শীতকালে ক্রমান্বয়ে তাপমাত্রা কমে যাচ্ছে। ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির অভাব দেখা দিচ্ছে, প্রাকৃতিক দূর্যোগ যেমন – বন্যা, সাইক্লোন, মরুকরণ, টর্নেডোর প্রকোপ ও তীব্রতা দিন দিন বেড়ে চলছে। অন্যদিকে শস্যের উৎপাদনশীলতা হ্রাস পেয়েছে, বিশুদ্ধ পানীয় জলের অভাব, ভূমিক্ষয়, সমুদ্র পানির মাত্রাতিরিক্ত লবণাক্ততাসহ নানা ধরনের পরিবর্তন আমাদের চোখে পড়ছে। এসব পরিবর্তন যে একদিনে কিংবা এক বছরে হঠাৎ হয়েছে তা নয়। পরিবর্তনগুলো হয়েছে আস্তে আস্তে। কিন্তু আমাদের সচেতনতার অভাবে তার মাত্রা এখন অনেক বেশি।
পরিবেশ দূষণ সাধারণত দুভাবে হয়ে থাকে। প্রথমটি হলো প্রাকৃতিকভাবে, অন্যটি হলো মানুষের দ্বারা, প্রাকৃতিক কারণে পরিবেশের বিপর্যয় আমাদের হাতে নেই। কিন্তু মানুষের কারণেই পরিবেশ বিপর্যয় কোনো সচেতন নাগরিকের কাম্য হতে পারে না। ক্ষণিকের একটু আনন্দের জন্য আমরা কতো কিছুই না করছি। নির্বিচারে বৃক্ষ নিধন করছি, বেশি ফসলের আশায় মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার করছি। অপরিকল্পিতভাবে রান্না ও গৃহস্থালীর কাজে জ্বালানির ব্যবহার করছি, ভূগর্ভস্থ পানির ও ব্যাপক উত্তোলন করছি। অপরিকল্পিতভাবে যেখানে সেখানে কলকারখানা নির্মাণ করছি ও সেখান হতে অপরিশোধিত বর্জ্যরে নির্গমন করছি। যানবাহনের কালো ধোয়া নির্গমন করছি। মাত্রাতিরিক্তভাবে বন্য পশু পাখি নির্বিচারে হত্যা করছি কিংবা এমন পরিবেশ সৃষ্টি করছি যে তারা বসবাসের কোনো সুযোগই পাচ্ছে না। এতে করে প্রশ্ন জাগে ‘এসব করে কি আমরা খুব ভালো আছি?’ উত্তর অবশ্যই ‘না’।
এসব কার্যক্রমের কারণে বায়ু মন্ডলে বৃদ্ধি পাচ্ছে ক্ষতিকর কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ। বৃদ্ধি পাচ্ছে পৃথিবীর তাপমাত্রা। আমরা জানি গাছপালা কার্বন ডাই অক্সাইড গ্রহণ করে এবং অক্সিজেন ত্যাগ করে। আর মানুষসহ অন্যান্য প্রাণী অক্সিজেন গ্রহণ করে এবং কার্বন ডাই অক্সাইড ত্যাগ করে। এভাবেই বায়ু মন্ডলে অক্সিজন ও কার্বন ডাই অক্সাইডের ভারসাম্য বজায় থাকে। কিন্তু আমরা যেভাবে নির্বিচারে গাছকে হত্যা করছি, হত্যাই বলবো কারণ জীবন রক্ষাকারী গাছেরও প্রাণ আছে। কিন্তু সে অনুসারে আমরা কি গাছ রোপন করছি?
গাছ শুধু আমাদের পরিবেশ রক্ষায় সাহায্য করে না। সাহায্য করে অর্থনৈতিকভাবেও। একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য সে দেশের মোট আয়তনের ২৫% বনভূমি থাকা প্রয়োজন। কিন্তু বাংলাদেশে বনভূমির পরিমাণ মাত্র ৬৭% ফলে এর বিরূপ প্রভাব মানুষ, পশুপাখি ও আবহাওয়ার উপর পড়ছে। অন্যদিকে মানুষের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে এবং অনেকটা একই তালে বাড়ছে কলকারখানা। ফলে জীবাশ্ম জ্বালানীর পোড়ানোর পরিমাণ বেড়ে চলছে।
কিন্তু এসব থেকে পরিত্রাণের চেষ্টা মানুষকেই করতে হবে। আমাদেরকেই তৈরি করতে হবে ভবিষ্যতের জন্য বিশুদ্ধ নগরী। বলা হয়ে থাকে সবুজ হচ্ছে সতেজতার প্রতীক। বাংলাদেশকে বলা হতো ‘সুজলা সুফলা, শস্য শ্যামলা বাংলাদেশ। সেই সুজলা-সুফলা, শস্যে ভরা বাংলাদেশ গড়া এখনো সম্ভব। এখনো সম্ভব বাংলাদেশের হারানো গৌরব, হারানো সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনার। বাংলাদেশে প্রায় ১৬ কোটি লোক বসবাস করে। এই ১৬ কোটির মধ্যে ৫ কোটি লোক যদিও বছরে অন্তত ২টি করে গাছ রোপন করে তাহলে এক বছরে ১০ কোটি নতুন গাছ আমরা পাবো। পাখি ফিরে যাবে তার আপন নীড়ে, বন্য প্রাণীরা ফিরে যাবে বনে। বাতাসে আস্তে আস্তে অক্সিজেন ও কার্বন-ডাই-অক্সাইডের ভারসাম্য গড়ে উঠবে। আমরা নিতে পারবো প্রাণ ভরে, বুক ফুলিয়ে নির্ম নি:শ্বাস। জীবন হয়ে উঠবে অনেক সুন্দর, সজীব। সবুজ, সুন্দর, সতেজ জীবন তখনই সম্ভব যখন আমরা সবুজ একটি ভুবন তৈরি করতে পারবো। একটু সচেতন হলেই আমরা আগামীর প্রজন্মের জন্য রেখে যেতে পারবো সবুজ একটি ভুবন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here