সোনালি সকাল ১৪ তম বছরে পদার্পন

আমি তখন নিতান্ত ছাত্রী। ঝোঁকের মাথায় সোনালি সকাল শুরু করলাম। সাইট একাই করলাম। কিছু নিজের লেখা, কিছু পরিচিতজনদের কাছে লেখা আহবান করলাম। সাড়া পেলাম অভুতিপূর্ব। সব লেখা নিজের হাতে সাইটে তুললাম। এখন এটা ঘোষণা দিতে হবে।
আমার পরিচিত এক বড় বোন আমাকে ফোন করে বললেন, ‘নিশাত সাইট করেছো ঠিক আছে, কিন্তু সম্পাদকের স্থানে নিজের নাম দিয়ে মানুষের হাসির খোরাক হয়ো না।’ কথাটি শুনে আরো ভয় পেয়ে গেলাম। ভাবতে ভাবতে আরো দু-তিনদিন চলে গেলো।
এরপর মায়ের উৎসাহে নিজেকে নিজে সাহস দিলাম। কষ্ট করে যখন সাইটটি করেছিই, তখন লিংকটা সবাইকে জানানো উচিত। ঠিক করলাম আমার পছন্দের কোনো গুণী একজনের হাত দিয়ে সোনালি সকালের হাতেখড়ি দিবো। হাতেখড়ি কথাটি এই জন্য বললাম কারণ এটা উদ্ভোধনের কথা আমি চিন্তাই আনি নি।
২০০৭ সালের সেপ্টেম্বরের ১ তারিখ চলে গেলাম আমার খুব প্রিয় ও শ্রদ্ধাভাজন ড. সিরাজুল ইসলাম স্যারের কাছে। উনি তখন এশিয়াটিক সোসাইটিতে বাংলাপিডিয়ার প্রধাণ সম্পাদক হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন।

author
স্যারের রুমে যাওয়া মাত্র অভিভাবকসুলভ হাসিতে তিনি আমাকে কুশলাদি জিজ্ঞেস করলেন। আমি খুব ইতস্তত করে উনাকে জানালাম আমি একটি সাইট করেছি। এবং অনুরোধ করলাম উনি যেনো সেটা একটু ওপেন করে দেখেন। আমি তার ফটোগ্রাফ আমার ক্যামেরায় তুলে নিবো। কথাটি শোনামাত্রই স্যার একদম গম্ভীর হয়ে গেলেন। সাথে সাথে চেয়ার থেকে উঠে দাড়িয়ে গেলেন। বললেন ‘দেড় ঘন্টা পরে তোমার কথা শুনবো। এখন আমি লাঞ্চ ব্রেকে যাবো‘ …… আমি কিছুটা হকচকিয়ে গেলাম। স্যার যেভাবে হেসে কথা বলছিলেন, হঠাৎ উনার এমন আচরণ আমি মনে অনেক কষ্ট পেলাম।
কিন্তু স্যারের প্রতি আমার বিশ্বাস আর ভালোবাসা এতো গভীর যে খারাপ কিছু মনে আনতেও পারছিলাম না।
দেড় ঘন্টা …. সে অনেক বড় সময়। কিছুতেই সময় কাটে না। ঘড়ির কাঁটা যেনো আস্তে থেকে আস্তে ঘুরছে ….. একবার মনে হলো চলে আসি, যেচে অপমান হওয়ার কিছু নেই। আরেকবার ভাবলাম ….. না থাক দেখেই আসি … শেষ কি হয় ……
জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘতম সময় পার করলাম আমি।
অবশেষে দেড়ঘন্টা পরে স্যারের রুমের উদ্দেশ্যে আমি ভবনের তিনতলায় প্রচন্ড ভয় নিয়ে উঠলাম। অফিসে জনমানবশূণ্য। আমি আরো নাভার্স হয়ে গেলাম। সবাই একসাথে অফিস ফেলে লাঞ্চে চলে গেলো!!! এরি মধ্যে অফিস সহকারীকে দেখলাম। স্যারের কথা জিজ্ঞেস করতেই তিনিও খুব মুড করে বললেন-‘স্যারের রুমে গিয়েই দেখেন। আমাকে কেন জিজ্ঞেস করছেন। ‘
আমার হার্টের কন্ডিশন ততোক্ষণে অনেক খারাপ অবস্থা। মনে হচ্ছিল আমি মারাই যাবো। আস্তে করে স্যারের রুমের দরজা খুলতেই দেখি অনেকগুলো হাস্যজ্বল মুখ একসাথে আমাকে অর্ভ্যথনা জানাচ্ছেন। আর স্যার আমাকে স্বাগত জানালেন …… টেবিলে একটি কেক আর ফুলের তোড়া। (এই দেড় ঘন্টায় সকলে মিলে প্রস্তুতি নিয়েছেন) …
আমি কিছুটা হতভম্ব। চোখ দিয়ে পানি ঝড়ছে। দেড়ঘন্টার টেনশন, ক্লান্তি, খিদে সব মিলিয়ে আমার কিছু বলার ভাষা নেই।
সিরাজ স্যার আমাকে হেসে বললেন-এখন তোমার সাইট উদ্ভোধন করবো। উদ্ভোধন তো উদ্ভোধনের মতোই হওয়া উচিত। স্যারকে কৃতজ্ঞতা জানানোর ভাষা আমার জানা নেই। এই উৎসাহ মনে হয় স্যারের দ্বারাই সম্ভব হয়েছে। থামিয়ে না দিয়ে, নতুনকে বরণ করে নেয়া, উনি আমাকে একবারও বলেন নি এই বয়সে সম্পাদক লেখা যাবে না…….
আজীবন এই স্মৃতি আমার মনের গভীরে যত্ন নিয়ে রেখে দিলাম।
সেই থেকে অনেক চরাই উতরাই পার হয়ে আজও সোনালি সকাল টিকে আছে। ১ সেপ্টেম্বর ২০২১ সোনালি সকাল ১৪ তম বছরে পদার্পন করলো।
সোনালি সকাল আমাকে দিয়েছে বাংলাদেশে প্রথম অনলাইন নারী সম্পাদকের স্বীকৃতি। সোনালি সকাল আমার প্রথম প্রেম, আমার প্রথম ভালোবাসা। বারবার নানা আঘাতে সোনালি সকাল জর্জরিত হলেও আবার ফিরে আসে আপনাদের কাছে।
সোনালি সকাল বিশ্বাস করে পজিটিভ বাংলাদেশ-এই স্লোগান নিয়ে এখনও সোনালি সকাল চলছে তার আপন বৈশিস্টে, আপন মহিমায়।
এটি সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক একটি পত্রিকা। সুস্থধারার সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও পজিটিভ খবরগুলোই সোনালি সকালে প্রকাশিত হয়। আপনাদের সবার ভালোবাসা নিয়ে সোনালি সকাল তার আলো ছড়িয়ে দিতে চায়। এবং আপনারা পাশে থাকলেই তা সম্ভব।
আমরা বিশ্বাস করি পজিটিভিটি।
আমরা বিশ্বাস করি সুস্থ ধারার সংস্কৃতি চর্চার।
সেই বিশ্বাসকে পুঁজি করেই সোনালি সকালের জন্মদিন কন্টকহীন হোক, এই প্রত্যাশা ব্যক্ত করছি।
আপনাদের সহযোগিতা ও ভালোবাসা চাই।
আপনাদের হোমস্ক্রিনে অতি শিঘ্রই সোনালি সকাল স্থান পাবে- এই আশাবাদ ব্যক্ত করছি।
সবাই ভালো থাকবেন।
সুস্থ ও নিরাপদ থাকবেন।

-নিশাত মাসফিকা
সম্পাদক ও প্রকাশক
সোনালি সকাল

4 COMMENTS

  1. শুভ কামনা। সোনালি সকালের আগামীর পথচলা হোক নিষ্কন্টক।

  2. শুভ জন্মদিন সোনালি সকাল। তোমার পথ চলা হোক অবিরাম। সোনালি সকালের তার মূল্যবোধকে অটুট রেখে আলো ছড়িয়ে দিক সমগ্র বিশ্বে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here